কম্পিউটার মাউসের নিচে কেন সবসময় লাল আলো জ্বলে?
ছবি: সংগৃহীত
আপনি যদি কখনও কম্পিউটার বা ল্যাপটপে মাউস ব্যবহার করে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে মাউসের নিচে সবসময় একটি লাল রঙের আলো জ্বলতে থাকে। কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, বাজারে সস্তা থেকে শুরু করে হাজারো নামী-দামী ব্র্যান্ডের মাউস পাওয়া গেলেও প্রায় সবখানেই কেন এই লাল আলোই ব্যবহার করা হয়? কেন এখানে নীল, সবুজ কিংবা অন্য কোনো রঙের আলো দেখা যায় না? এর পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের এক চমৎকার মেলবন্ধন।
আলোযুক্ত এই মাউসগুলোকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘অপটিক্যাল মাউস’ বলা হয়। বিংশ শতকের নব্বইয়ের দশকে যখন প্রথম এই অপটিক্যাল মাউস বাজারে আসে, তখন থেকেই লাল আলোর ব্যবহার শুরু হয়। সে সময়ে লাল আলো তৈরি করার প্রযুক্তি যেমন সহজলভ্য ছিল, তেমনই মাউসের ভেতরের সেন্সরের জন্যও এই লাল আলো শনাক্ত করা বেশ সহজ ছিল। তাই বিজ্ঞানীরা এটিকেই মাউসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত আলো হিসেবে বেছে নেন।
আজকের প্রজন্মের অনেক ব্যবহারকারী হয়তো জানেন না যে একসময় মাউসের নিচে এমন কোনো আলো জ্বলত না। সেই শুরুর দিনগুলোতে মাউসের ভেতরে একটি ভারী রাবার বা ধাতুর তৈরি গোল বল থাকত। টেবিল বা সমতল পৃষ্ঠে মাউসটি নাড়ালে ভেতরের সেই বলটিও ঘুরত। সেই বলের ঘূর্ণন থেকেই মাউসের ভেতরে থাকা সেন্সর নড়াচড়া বুঝতে পারত এবং কম্পিউটারের স্ক্রিনে কার্সরটি নড়াচড়া করত। তবে এই বলযুক্ত মাউসের একটি বড় সমস্যা ছিল যে এটি মাউস প্যাড ছাড়া সাধারণ টেবিল বা মসৃণ পৃষ্ঠে ঠিকমতো কাজ করত না এবং বলটি পিছলে যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলযুক্ত মাউসের এই সমস্যা দূর করতে বলটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানে যুক্ত করা হয় একটি লাল লাইট এমিটিং ডায়োড বা এলইডি আলো এবং একটি ক্যামেরা সেন্সর। এই অপটিক্যাল মাউসের মূল কাজ হলো যখনই আপনি মাউসটি নাড়াবেন, তখন নিচের আলোটি পৃষ্ঠের ওপর পড়বে। সেই লাল আলোতে মাউসের নিচে থাকা সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার ছবি তোলে। এরপর সেন্সরটি এই ছবিগুলোর তুলনা করে হিসাব করে নেয় যে মাউসটি কোন দিকে কতটুকু নড়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির কারণেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে কার্সরের নড়াচড়া এখন অনেক বেশি মসৃণ ও নিখুঁত হয়েছে।
মাউসে লাল আলো ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম। নব্বইয়ের দশকে লাল রঙের এলইডি ছিল সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে সস্তায় তৈরি করা সম্ভব এমন একটি প্রযুক্তি। তাই মাউসের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখতে এটি ছিল সেরা বিকল্প। এছাড়া মাউসের ভেতরে থাকা ক্যামেরা সেন্সরটি লাল আলোর প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। লাল আলোতে যেকোনো পৃষ্ঠের গঠন অনেক বেশি স্পষ্ট দেখায়, যা সেন্সরের জন্য ছবি তুলতে সুবিধা দেয়।
এর পেছনে আরেকটি বড় বৈজ্ঞানিক কারণ হলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়। লাল আলো জ্বলাতে নীল বা সবুজ আলোর তুলনায় অনেক কম ভোল্টেজ বা বৈদ্যুতিক শক্তির প্রয়োজন হয়। এর ফলে কম্পিউটার বা ল্যাপটপের বিদ্যুৎ অনেক কম খরচ হয় এবং বর্তমানে বাজারে থাকা ব্যাটারিচালিত তারবিহীন বা ওয়্যারলেস মাউসগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সচল থাকে।
অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে বাজারে ‘ইনফ্রারেড মাউস’ বা অবলোহিত আলো চালিত মাউসও চলে এসেছে। এই ধরনের মাউসের নিচে মানুষের চোখে দৃশ্যমান কোনো আলো জ্বলে না, তবুও এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করে। কারণ এতে সাধারণ এলইডির পরিবর্তে অবলোহিত আলো বা ইনফ্রারেড লেজার ডায়োড ব্যবহার করা হয়। এই আলো মানুষের চোখে দেখা না গেলেও মাউসের ভেতরের সেন্সরটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই আলো ব্যবহার করে কাজ করতে পারে।