অভিবাসী থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, লামিন-নিকোর সাফল্যের অনুপ্রেরণার গল্প
ফাইল ছবি
স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের দুই উজ্জ্বল তারকা লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস। মাঠে তাদের বোঝাপড়া যেমন দারুণ, মাঠের বাইরেও তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে এই দুই ফুটবলারের সাফল্যের পেছনে রয়েছে অভিবাসন, সংগ্রাম, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের দীর্ঘ এক গল্প।
রবিবার রাতে বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইয়ামাল ও নিকো। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পর বিশ্বকাপও জিতে নেন তারা। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ফুটবলার শুধু স্পেনের নতুন প্রজন্মের প্রতিভাই নন, বরং বহুসাংস্কৃতিক ও অভিবাসী-সমৃদ্ধ আধুনিক স্পেনেরও প্রতীক।
ভালো জীবনের খোঁজে শুরু হয়েছিল যাত্রা
নিকো উইলিয়ামস ও তার বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামসের বাবা-মা ১৯৯৪ সালে ঘানা ছেড়ে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমান। স্ত্রী মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফেলিক্স উইলিয়ামস সাহারা মরুভূমির একটি অংশসহ দীর্ঘ পথ হেঁটে অতিক্রম করেন। নিকো পরে এক সাক্ষাৎকারে জানান, তার মা যাত্রাপথের কিছু অংশ খালি পায়েও হেঁটেছিলেন।
স্পেনের মেলিয়ায় পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের লাইবেরিয়ার নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। পরে ক্যারিটাসের সহায়তায় তারা বিলবাওয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জন্ম নেন ইনিয়াকি এবং পরে পরিবারটি পাম্পলোনায় চলে গেলে ২০০২ সালে জন্ম হয় নিকো উইলিয়ামসের।
পরিবারের ত্যাগেই নিকোর বেড়ে ওঠা
পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে নিকোর বাবা দীর্ঘ ১০ বছর লন্ডনে বিভিন্ন কাজ করেন। এই সময়ে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বড় ভাই ইনিয়াকি। স্কুলে নিয়ে যাওয়া, খাবার খাওয়ানো থেকে শুরু করে ফুটবল ও জীবনের নানা শিক্ষা সবই ছোট ভাইকে দিয়েছেন তিনি।
নিকো একাধিকবার বলেছেন, ইনিয়াকি শুধু তার ভাই নন, অনেকটা বাবার মতোও। দুই ভাইই পরে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে খেলেন। ২০২১ সালে ক্লাবটির হয়ে একসঙ্গে মাঠে নেমে ইতিহাসও গড়েন তারা।
লামিন ইয়ামালের গল্পও সংগ্রামের
লামিন ইয়ামালের পরিবারও আফ্রিকান অভিবাসী। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো থেকে এবং মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে স্পেনে আসেন। ইয়ামালের দাদি প্রথমে একাই মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমান। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেখানে বসবাস শুরু করেন। বার্সেলোনার উপকণ্ঠের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দাতেই বেড়ে ওঠেন ইয়ামাল।
শৈশবেই ফুটবলের প্রতি অসাধারণ প্রতিভা দেখিয়ে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে জায়গা করে নেন তিনি। এরপর একের পর এক বয়সভিত্তিক রেকর্ড গড়ে খুব অল্প সময়েই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন।
মেসির সঙ্গে শৈশবের সেই ছবি
শিশু বয়সে ইউনিসেফের একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে লিওনেল মেসির কোলে থাকা লামিন ইয়ামালের একটি ছবি সম্প্রতি আবারও আলোচনায় আসে। ইয়ামালের বাবা মজা করে বলেন, সেটি হয়তো কাকতালীয় ঘটনা, আবার মেসির আশীর্বাদও হতে পারে।
বন্ধুত্বেও অনন্য ইয়ামাল-নিকো
স্পেন জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ইয়ামাল ও নিকোর মধ্যে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ১৬ বছর বয়সী ইয়ামালের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন নিকোকে। সেই সম্পর্ক এখনো অটুট।
জাতীয় দলের অনুশীলন, ম্যাচ কিংবা উদযাপন সব জায়গাতেই একসঙ্গে দেখা যায় এই দুই তারকাকে। গোল উদযাপনের নাচও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে।
অভিবাসী পরিবারের সাফল্যের প্রতীক
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির নেতৃত্ব ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোইসেস রুইসের মতে, ইয়ামাল ও নিকো নতুন স্পেনের ইতিবাচক প্রতীক। তাদের গল্প প্রমাণ করে, সংগ্রাম, ত্যাগ ও সুযোগ পেলে অভিবাসী পরিবারের সন্তানরাও বিশ্বমঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেন।
স্প্যানিশ ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ইয়ামাল ও নিকো শুধু বিশ্বমানের ফুটবলারই নন, তারা সহাবস্থান, বৈচিত্র্য ও মানবিক মূল্যবোধেরও উজ্জ্বল উদাহরণ। তাদের সাফল্য আধুনিক স্পেনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি।