ফিলিস্তিনিদের দমনে কুমির-হিংস্র কুকুর ব্যবহার করছে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনিদের দমনে কুমির-হিংস্র কুকুর ব্যবহার করছে ইসরায়েল

ছবিঃ সংগৃহীত।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিয়ন্ত্রণে এবার নীল নদ এলাকার হিংস্র কুমির ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ইসরায়েল।দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রাণীভিত্তিক সংঘাত (অ্যানিমেল ওয়ারফেয়ার) নতুনভাবে আলোচনায় আসল। দেশটির বৃহত্তম কারাগার 'কেতজিওত'-এর চারপাশে পরিখা খনন করে সেখানে কুমির ছেড়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রজাতিটিকে কৃষিজ বন্যপ্রাণী হিসেবে নতুন শ্রেণিবিন্যাস করেছে।

মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত অভিবাসী আটক কেন্দ্রের অনুসরণে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এটা মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক নিপীড়নের নতুন এক চক্রান্ত।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে বন্যপ্রাণী ও গবাদিপশুকে ব্যবহার করার কৌশল ইসরায়েলের জন্য নতুন নয়। জায়োনিস্ট আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই ফিলিস্তিনের মূল অধিবাসীদের অবমাননা করতে তাদের প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হতো।

সাবেক ইসরায়েলি নেতাদের মুখে ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশ্যে কুকুর, গিরগিটি, তেলাপোকা কিংবা সম্প্রতি গাজায় গণহত্যার সময় মানব পশু অভিধা ব্যবহারে সেই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে।

তবে কেবল রূপক বা গালিগালাজেই সীমাবদ্ধ না থেকে ইসরায়েল বাস্তব জীবনেও নানা প্রাণীকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করে আসছে।

ইসরায়েলের এই প্রাণীভিত্তিক নিপীড়নের ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমলে ফিলিস্তিনি বিপ্লবীদের ওপর হিংস্র কুকুর ছেড়ে দেওয়া হতো। ১৯৬৭ সালের পর বাইবেলে উল্লিখিত বিভিন্ন প্রাণীকে ফিলিস্তিনের প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার অজুহাতে বেদুইনদের প্রথাগত চারণভূমি ও পানির উৎস থেকে বিতাড়িত করা হয়।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন শত শত গবাদিপশু ও উট জব্দ করে তাদের ওপর ভারী জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। এমনকি ফিলিস্তিনের নিজস্ব প্রজাতির বিষধর সাপকে নিবন্ধিত করে ইসরায়েল নিজেদের জাতীয় সাপ হিসেবে ঘোষণা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জনজীবন ও কৃষিকাজ ধ্বংস করতে নিয়মিতভাবে বুনো শূকর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দখলীকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন গ্রামে প্রায়শই বন্দোবস্তকারী ও ইসরায়েলি বাহিনী ট্রাক থেকে শত শত হিংস্র বুনো শূকর ছেড়ে দেয়, যা ফিলিস্তিনিদের ফসল ধ্বংসের পাশাপাশি তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের সময়ও প্রায় সব ধরনের গবাদিপশু ও গৃহপালিত প্রাণী ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেঁচে থাকা গাধা ও ঘোড়াগুলোকে ছিনিয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

কারাগার ও আটক কেন্দ্রগুলোতে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়মিত চিত্র। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্যানাইন ইউনিট দীর্ঘ দিন ধরে অভিযান ও বন্দিশালায় সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করতে এবং গুরুতর নির্যাতন চালাতে এসব কুকুর ব্যবহার করে আসছে। অথচ বৈপরীত্যের বিষয় হলো, ২০০৩ সালে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত হাঁস ও রাজহাঁসের ওপর নিষ্ঠুরতা রোধে বিশেষ আইন করলেও ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর জোরপূর্বক খাবার খাওয়ানো এবং অমানবিক নির্যাতনকে আইনি বৈধতা দিয়েছে।

বেন গভিরের এই সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি মূলত ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড, জীববৈচিত্র্য ও মানবিক মর্যাদা হরণের এক শতবর্ষী আগ্রাসনেরই নতুন সংযোজন।

প্রাণীদের সুরক্ষার নামে একদিকে যেমন ফিলিস্তিনের নিজস্ব পরিবেশ পুনর্গঠন করা হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে সেই একই প্রাণীকুলকে ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন ও নিপীড়ন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েলি প্রশাসন।