‘মা, আমি যাব, আর আসব’—ফিরলেন না অক্ষর

‘মা, আমি যাব, আর আসব’—ফিরলেন না অক্ষর

ফাইল ছবি

শনিবার (১ আগস্ট) রাত তখন সাড়ে ১০টা। খুলনা মহানগরীর শহীদ হাদিস পার্কের সামনের মান্নান চপটি গলির ৬৮/১০, যশোর রোডের ‘দোলন’ নামের বহুতলবিশিষ্ট ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নীরবতা।

ভেতরে আত্মীয়-স্বজনের চাপা কান্না আর এক অভাগা মা-বোনকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।

দরজায় কড়া নাড়তেই কেউ একজন এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন। অপরিচিত মুখ দেখে প্রথমেই এক মায়ের প্রশ্ন, ‘আপনারা কারা? কেন এসেছেন? আমার অক্ষর কোথায় ?’

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস কারো নেই। কারণ, যার খোঁজ করছেন তিনি, সেই অক্ষর- অর্থাৎ অক্ষর সৌভিক রায় আর কোনোদিন ফিরবেন না।

শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান ঢাকার একটি ভিসা এজেন্সির কর্মী অক্ষর সৌভিক রায়। অফিসের টিম নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুশোকে। আর এ খবর খুলনার বাসায় পৌঁছালে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেমন যেন নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

কিন্তু রাত পর্যন্ত ছেলের মৃত্যুর খবর পুরোপুরি জানানো হয়নি মা শুক্লা রায়কে। তবু যেন একজন মায়ের মন সব বুঝে গেছে। তিনি বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, আবার জেগে উঠে একই কথা বলছেন। “আমার অক্ষর ফোন করে বলেছিল, ‘মা আমি একটু সমুদ্রে যাব।’ আমি বলেছিলাম, যাস না।

ও বলল, ‘না, আমি যাব। আমার কিছু হবে না। আমি যাব আর আসব।’” শেষ কথোপকথনের স্মৃতিটুকুই যেন এখন মায়ের বুকের ভেতর বারবার ফিরে আসছে।

করোনাকালে বাবা শেখর রায়কে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব প্রায় পুরোপুরি এসে পড়ে একমাত্র ছেলে অক্ষরের কাঁধে। মা আর ছোট বোন শীর্ষা রায়কে নিয়েই ছিল তাদের ছোট সংসার। শীর্ষা পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেন। আর অক্ষর ঢাকায় চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছিলেন। সেই সংসার আজ এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে।

ঘরের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যায়নি। মায়ের কান্না আর অস্থিরতা ঘরের বাতাসকেও যেন ভারি করে তুলেছিল।

ফ্ল্যাটের বাইরে এসে কথা হয় অক্ষরের এক মাসির সঙ্গে। নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। কান্না সামলে বলেন, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ফোনে খবর পান। কলেজ থেকে বাসায় ফিরে অক্ষরের ছোট বোন শীর্ষা তাকে বিষয়টি জানান। এরপর বড় বোনকে নিয়ে ছুটে আসেন। কক্সবাজার থেকে পাঠানো ভিডিও দেখে নিশ্চিত হন, সেটিই অক্ষরের মরদেহ।

কথা বলতে বলতেই তিনি ঘরে থাকা অক্ষরের ছোটবেলার ছবির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই ছবিটা আমি তুলিয়েছিলাম। তিন বছর বয়সে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে সাজিয়ে, চোখে কাজল দিয়ে ছবি তুলেছিলাম। তখন কে জানত, একদিন এই ছবিটাই স্মৃতি হয়ে থাকবে!

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় খুলনার জোহরা খাতুন বিদ্যা নিকেতনে পড়াশোনা শুরু করেন অক্ষর। পরে খুলনা জিলা স্কুল এবং ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়েন। উচ্চশিক্ষার জন্য যান ভারতের গুজরাটে। সেখান থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে ঢাকার একটি ভিসা এজেন্সিতে চাকরি নেন। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে সেই ভ্রমণই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ সফর।

 

অক্ষরের প্রতিবেশী শেখর সাহানি মনি জানান, পরিবারের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে অক্ষরকে দেখেছি। স্কুলে আনা-নেওয়া করেছি। পরিবারের নানা প্রয়োজনে পাশে থেকেছি। এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া খুব কঠিন।

তিনি জানান, অক্ষরদের আদি বাড়ি মাগুরায়। ফেরিঘাট এলাকার বাড়িটি ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারটি খুলনায় ভাড়া বাসায় ওঠে।

ঘটনার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটা কীভাবে পড়ে গেল, বুঝলাম না। মানে ছিঁড়ে তো পড়েনি। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অক্ষরের বড় চাচা শংকর রায়সহ কয়েকজন আত্মীয় রাতেই কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। খুলনার বাসায় থাকা স্বজনরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখার চেষ্টা করছেন। 

রাতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। তারা কক্সবাজারের পথে রয়েছেন। রবিবার (২ আগস্ট) ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।

খুলনার সেই ছোট্ট ভাড়া বাসায় এখনো অপেক্ষা করছেন এক মা। তিনি এখনো বিশ্বাস করতে চান, দরজায় কড়া নাড়লেই হয়ত ছেলে ফিরে এসে বলবে, ‘মা, আমি এসে গেছি।’ কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। তাই রাত গভীর হলেও বারবার শুধু একটি প্রশ্নই ভেসে আসে, ‘আমার অক্ষর কোথায়?’