১৫০ বছর পর লাইব্রেরিতে ফিরল হারিয়ে যাওয়া বই

১৫০ বছর পর লাইব্রেরিতে ফিরল হারিয়ে যাওয়া বই

সংগৃহীত ছবি

বাড়ির পুরোনো ফায়ারপ্লেস বা অগ্নিকুণ্ড সংস্কার করতে গিয়ে ইটের দেয়ালের ভেতরে চা-পাতার এক কাঠের বাক্সের সন্ধান পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় শহর কিয়ামার স্থানীয় বাসিন্দা রস সিমন্স। বাক্সের ভেতর সংরক্ষিত জিনিসপত্রের ধুলা ঝাড়তেই বেরিয়ে আসে এক বিরল ইতিহাস—গ্রিক প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কিত ‘অ্যান্টিকুইটিজ অব এথেন্স’ নামের একটি শতবর্ষী বই। 

কিয়ামা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে হারিয়ে যাওয়া এই মূল্যবান বইটি প্রায় ১৫০ বছর পর অবশেষে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ইটের দেয়ালের ভেতর বন্ধ অবস্থায় থাকায় আর্দ্রতা ও পানিতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বইটির ঐতিহাসিক আবেদন এতটুকু কমেনি।

কিয়ামা লাইব্রেরির ব্যবস্থাপক মিশেল হাডসন বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানান, তাদের লাইব্রেরির দীর্ঘ ইতিহাসে এত পুরোনো কোনো বই আগে কখনো ফেরত আসেনি। সাধারণত মানুষ যখন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাড়ি বা সম্পত্তি পরিষ্কার করে, তখন সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরোনো বইপত্র লাইব্রেরিতে ফিরে আসার নজির থাকে। কিন্তু দেড় শ বছর আগের একটি বই উদ্ধার হওয়া একেবারেই নজিরবিহীন ঘটনা। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান্টিকুইটিজ অব এথেন্স’ বইটি ১৮৭২ সালে কিয়ামা লাইব্রেরি চালুর সময় সংগৃহীত প্রায় এক হাজার বইয়ের প্রাথমিক তালিকার ৫০৬ নম্বর হিসেবে নিবন্ধিত ছিল। লাইব্রেরি খোলার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এটি নিখোঁজ হয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বইটি উদ্ধারের পর ৭৭ বছর বয়সী রস সিমন্স ধারণা করছেন, তার প্রপিতামহ জন সিমন্স এই বাড়িটিতে থাকার সময় বইটি লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়েছিলেন এবং কোনো কারণে তা ফেরত দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, সেই সময়ে তার প্রপিতামহই ওই কটেজে বাস করতেন এবং তার সন্তানেরা বই পড়ার মতো বড় হয়নি। সিমন্সের প্রপিতামহ একসময় কিয়ামা পৌরসভার কাউন্সিলর (অল্ডারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে পেশায় একজন ইংরেজ অভিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন বইটি লাইব্রেরিতে সময়মতো ফেরত দেননি বা কেনই বা তা ফায়ারপ্লেসে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সে রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি।

দেড় শতাব্দী ধরে নিখোঁজ থাকা এই বইটির ওপর বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলে বকেয়া জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ ডলারের সমান। লাইব্রেরি ব্যবস্থাপক হাডসন জানান, ১৮৭০-এর দশকে বইয়ের কভারের ভেতরের পাতায় লেখা নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে ৩ পেন্স হারে এই জরিমানা হিসাব করা হয়েছে। তবে ওই সময়ের ঋণগ্রহীতাদের নামধাম-সংবলিত মূল রেজিস্ট্রার খাতাটি বহু আগেই হারিয়ে যাওয়ায় শেষ কার নামে বইটি ইস্যু করা হয়েছিল তা জানার আর কোনো উপায় নেই। তৎকালীন কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, পূর্বের বই ফেরত না দিলে এবং বকেয়া জরিমানা পরিশোধ না করা পর্যন্ত নতুন বই নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। সম্ভবত সেই জরিমানার ভয়েই গ্রাহক বইটি আর কখনো ফেরত দেওয়ার সাহস পাননি।

১৮৭০-এর দশকে কিয়ামা লাইব্রেরির কিছু প্রাচীন ও অদ্ভুত নিয়ম প্রচলিত ছিল, যা আজকের দিনে কিছুটা হাস্যকর মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, যে পরিবারের অন্তত ছয়জন সদস্য পড়তে পারতেন, তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ তিনটি বই ধার নিতে পারতেন, যদিও আধুনিক যুগে বই নেওয়ার জন্য পড়ার যোগ্যতা প্রমাণের আর প্রয়োজন পড়ে না। তা ছাড়া মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোনো পাঠক লাইব্রেরিতে প্রবেশ করলে তাকে বই ধার দেওয়া হতো না। বর্তমান যুগে অন্য পাঠকদের বিভ্রান্ত বা সমস্যা না করলে নির্দিষ্টভাবে নেশাগ্রস্তদের প্রবেশের ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রাখা হয় না।

পরিবারের এই শতবর্ষী ঋণের কারণে লাইব্রেরিয়ানদের ক্ষোভের মুখোমুখি হওয়ার কোনো ভয় পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে হাসিমুখে রস সিমন্স বলেন, কর্মজীবনে তিনি বহু ক্ষুব্ধ গ্রাহকের মুখোমুখি হয়েছেন, তাই এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অন্যদিকে, কিয়ামা লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিরল এই ঐতিহাসিক বইটি আর কোনো সাধারণ পাঠকের কাছে ধার হিসেবে দেওয়া হবে না। কিয়ামা লাইব্রেরির স্থানীয় ইতিহাস সংগ্রহশালায় এটি প্রদর্শনের জন্য বিশেষ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ফের কোনো বইয়ের জন্য তাদের আরও দেড় শ বছর অপেক্ষা করতে না হয়।

সূত্র: সিএনএন