স্পেনের বিরুদ্ধে ২২ দেশের চিঠি, জরুরি সভা ডেকেছে ইইউ
সংগৃহীত ছবি
মরক্কো সীমান্তবর্তী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসনসংকট তৈরি হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। স্পেনের সঙ্গে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তীব্র তর্ক-বিতর্কের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে আগামী মঙ্গলবার জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসী একযোগে সেউতায় প্রবেশ করার পর সীমান্ত সুরক্ষা এবং অভিন্ন অভিবাসন নীতি রক্ষা করার তাগিদ দিয়ে ইইউ-এর ২২টি সদস্য রাষ্ট্র যৌথ চিঠি জারি করার পরপরই এই জরুরি আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংকট ঘনীভূত হওয়ার মুখে স্পেন থেকে আগতদের ক্ষেত্রে মুক্ত চলাচলের শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইতালি, যা ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলো সমর্থন জানিয়েছে। ইতালির এই সিদ্ধান্তকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ‘স্বার্থপর, বিভাজন সৃষ্টিকারী ও অবৈধ’ প্রতিক্রিয়া বলে কড়া সমালোচনা করেছেন।
তবে ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়েছে স্পেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফেরনান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সেউতার পরিস্থিতি এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে ৩০ জুলাই অনুপ্রবেশ করা অভিবাসীদের প্রায় সবাইকেই ইতিমধ্যে সেউতা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সমুদ্রপথে অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে একটি ভাসমান কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা (ইনফ্ল্যাটেবল ব্যারিয়ার) তৈরির কাজ চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই অনুপ্রবেশের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ইইউ সভাপতি অ্যান্টোনিও কস্তা, ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেইন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের দায়িত্বে থাকা আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন ২২টি দেশের নেতারা। নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের শীর্ষ নেতাদের স্বাক্ষর করা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, অবৈধ উপায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ সম্ভব—এমন ধারণা তৈরি হওয়াটাই একটি বড় নিরাপত্তাঝুঁকি। এই ধরনের বার্তা অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রবণতাকে উৎসাহিত করবে, যা ইইউ-এর অভিন্ন অভিবাসন নীতির ভিত্তি দুর্বল করে দেবে এবং সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর এর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেইনকে দেওয়া একটি পৃথক চিঠিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ কিছু ইউরোপীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে স্পেনের সরকার সীমান্তের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং মূল ইউরোপ মহাদেশের দিকে এই অভিবাসীদের অননুমোদিত পদযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ দেশ সহানুভূতি ও সহযোগিতা দেখালেও কিছু দেশ ‘পূর্বসংস্কার, ভুয়া খবর, অজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ’ দ্বারা চালিত হয়ে স্পেনের ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সেউতা মূলত শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়।
এর আগে শুক্রবার এক বক্তব্যে সানচেজ অভিযোগ করেছিলেন যে, সুপ্রিম কোর্টের সম্প্রতি দেওয়া একটি রায়কে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা এই সংকট তৈরি করেছে, যে রায়ে সমুদ্রপথে আসা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানোর সরকারি স্বাধীনতায় কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছিল।
সেউতার এই ঘটনায় বর্তমানে শেনজেন জোন নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা কোনো সীমান্ত চেকপোস্ট ছাড়াই ইউরোপের ২৯টি দেশের প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনের জন্য ইতালির শেনজেন সুবিধা এক মাসের জন্য স্থগিত করার পর ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও পর্তুগালও নিজেদের সীমান্তে অনুরূপ চেকপোস্ট বসানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন শেনজেন সহযোগিতা স্থগিত করার বিষয়টিসহ সব ধরনের বিকল্প পর্যালোচনার জন্য ইইউ-এর প্রতি আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতার দৃশ্যগুলোকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন যে নিয়ম না মেনে কেউ ইইউ-তে প্রবেশ করতে পারে না। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস অবিলম্বে মরক্কোকে তাদের এসব অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত নেওয়ার তাগিদ দেন। অন্যদিকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানান, তিনি পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং যুক্তরাজ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করছে।
মরক্কোর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং চাকরির সুযোগের অভাবে গত বছর দেশটিতে জেন-জি আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। মূল ভূখণ্ড না হলেও মেলিলাই এবং সেউতাই হলো আফ্রিকার মাটিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত। ফলে সেউতা দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়ে গ্রীষ্মকালে তরুণ ও অভিবাসীদের একটি বড় অংশ সাঁতার কেটে বা সমুদ্র উপকূলের বেড়া ঘুরে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে। ২০২১ সালেও কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় ৮ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিল, যা মরক্কোর সঙ্গে স্পেনের তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
উল্লেখ্য, স্পেনে অভিবাসন-সংক্রান্ত নীতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা শিথিল। সম্প্রতি গত এপ্রিলে স্পেন সরকার দেশে থাকা প্রায় ৫ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীকে আইনি বৈধতা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যাতে তারা দেশটির নিয়মিত শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারেন।
সূত্র: বিবিসি