স্ত্রীদের অভিমান ভাঙতে যা করতেন মহানবী (সা.)
ফাইল ছবি
মান-অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, হাসি-কান্না কিংবা অভিমান ভাঙার মুহূর্ত—এ সবই একটি স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের অংশ। কিন্তু এসব পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, কীভাবে ভালোবাসা ও সম্মান অটুট রেখে মতভেদ মিটিয়ে নিতে হবে—তার সর্বোত্তম আদর্শ স্থাপন করেছেন মহানবী (সা.)।
তাঁর সংসার কোনো অলৌকিক, আবেগশূন্য বা যান্ত্রিক পরিবেশ ছিল না; বরং তা ছিল মানবিক অনুভূতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও গভীর ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তাআলা তাঁর মহান চরিত্রের প্রশংসা করে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৪)
নবীজির পারিবারিক জীবন আমাদের শেখায়, সুখী দাম্পত্য মানে মতবিরোধহীন জীবন নয়; বরং মতবিরোধের মধ্যেও একে অপরের মর্যাদা রক্ষা করা, কোমল আচরণ করা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করে তোলাই প্রকৃত সফলতা। তাঁর সংসারের প্রতিটি ঘটনা আজও প্রতিটি পরিবার, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর জন্য এক অনন্য জীবনপাঠ।
মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মান-অভিমান
আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর পারিবারিক জীবনের একটি ঘটনা দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও প্রজ্ঞার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। একবার তাঁদের মধ্যে একটি বিষয়ে সামান্য মতপার্থক্য দেখা দিল। পরিস্থিতিকে সহজ ও সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে মীমাংসা করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হেসে আয়েশা (রা.)-কে বললেন, ‘আমাদের এই বিষয়টির বিচার করার জন্য তুমি কাকে পছন্দ করো? তুমি কি ওমরকে মেনে নেবে?’
আয়েশা (রা.) বললেন, ‘না, ওমর খুব কঠোর স্বভাবের; আমি তাঁকে বিচারক হিসেবে চাই না।’ তখন নবীজি বললেন, “তাহলে কি তোমার পিতা আবু বকরকে ডাকব?” তিনি এতে সম্মতি দিলেন।
আবু বকর (রা.) এসে উপস্থিত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি আগে বলবে, নাকি আমি বলব?’ আয়েশা (রা.) অভিমানের সুরে বললেন, “আপনিই বলুন, তবে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলবেন না।’ মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত কষ্ট পেলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল কি কখন সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলেন?’—এ কথা বলে তিনি শাসনের উদ্দেশ্যে মেয়ের দিকে হাত বাড়ালেন।
আয়েশা (রা.) সঙ্গে সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে আশ্রয় নিলেন। তখন মহানবী (সা.) আবু বকর (রা.)-কে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমরা তো আপনাকে এ কাজের জন্য ডেকে আনিনি, আর আপনার কাছ থেকে এমন আচরণও আশা করিনি।
’ এরপর তিনি তাঁকে ফিরে যেতে বললেন। (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৫৬৩৩)
আবু বকর (রা.) চলে যাওয়ার পর নবীজি স্নেহভরে আয়েশা (রা.)-কে বললেন, ‘দেখলে তো, তোমাকে তোমার বাবার হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করলাম।’ কিছুক্ষণ পর আবু বকর (রা.) আবার ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে দেখলেন, স্বামী-স্ত্রীর সব মান-অভিমান দূর হয়ে গেছে। তাঁরা হাসিমুখে গল্প করছেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি মজা করে বললেন, ‘আপনাদের ঝগড়ার সময় যেমন আমাকে অংশীদার বানিয়েছিলেন, এখন মিলনের আনন্দেও কি আমাকে একটু শরিক করবেন?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসিমুখে বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। এসো, তুমিও আমাদের আনন্দে শরিক হও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৯)
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, দাম্পত্য জীবনের মতবিরোধ কখনো কঠোরতা দিয়ে নয়; বরং হাস্যরস, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাধান করাই উত্তম।
মনখারাপের দিনে সান্ত্বনার পরশ
সংসারে কখনো কখনো কিছু কথা হৃদয়কে গভীরভাবে আহত করে। একজন আদর্শ স্বামীর দায়িত্ব হলো সেই কষ্ট বুঝে স্ত্রীকে মানসিকভাবে শক্তি দেওয়া। একদিন সাফিয়া (রা.)-কে কাঁদতে দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) কারণ জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, হাফসা (রা.) তাঁকে ‘ইহুদির কন্যা’ বলে কটাক্ষ করেছেন। যদিও সাফিয়া (রা.) বনু কুরাইজা গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছিলেন, তবুও এ কথায় তাঁর হৃদয়ে গভীর আঘাত লেগেছিল।
মহানবী (সা.) তাঁর মনোবল ফিরিয়ে দিতে অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি তো একজন নবীর -হারুন (আ.)- এর বংশধর, তোমার চাচাও একজন নবী (মুসা আ.), আর তুমি একজন নবীর -মুহাম্মদ সা.)-এরও স্ত্রী। তাহলে সে কোন ভিত্তিতে তোমার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে?’ এরপর তিনি হাফসা (রা.)-কে ডেকে বললেন, ‘হাফসা, আল্লাহকে ভয় করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৪)
মাত্র কয়েকটি বাক্যেই তিনি সাফিয়া (রা.)-এর আত্মসম্মান পুনরুদ্ধার করলেন এবং অন্যায় মন্তব্যেরও যথাযথ সংশোধন করলেন। এটি একজন আদর্শ স্বামীর প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
সংসারের যেকোনো সংকটে সংযম ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব
পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে তখন, যখন মিথ্যা অপবাদ, গুজব বা ভুল বোঝাবুঝি সম্পর্কের ভিত্তিকে নাড়া দেয়। 'ইফকের ঘটনা' ছিল তেমনই এক কঠিন পরীক্ষা। আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে যখন মিথ্যা অপবাদ রটানো হলো, তখন পুরো মদিনা অস্থির হয়ে উঠেছিল। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও রাসুলুল্লাহ (সা.) অসাধারণ ধৈর্য, সংযম ও ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দিয়েছেন।
আয়েশা (রা.) তখন অসুস্থ ছিলেন। তিনি প্রথমে অপবাদের কথা জানতেন না। তবে তিনি লক্ষ্য করলেন, অসুস্থ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.) আগের মতো দীর্ঘক্ষণ পাশে বসছেন না। তিনি শুধু এসে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করতেন, ‘মেয়েটি কেমন আছে?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৫০)
যখন বিষয়টি স্পষ্ট হলো, তখনো তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেননি। বরং বলেছিলেন, ‘যদি তুমি নির্দোষ হও, তবে আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে নিষ্পাপ প্রমাণ করবেন।’ অবশেষে আল্লাহ তাআলা সুরা নুরের আয়াত নাজিল করে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতার ঘোষণা দেন। (সুরা : নুর, আয়াত : ১১)
এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, গুজব বা অভিযোগ শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটনের জন্য ধৈর্য, সংযম ও আল্লাহর ওপর ভরসা করাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
নবীজির পারিবারিক জীবন আমাদের সামনে এমন এক দাম্পত্য আদর্শ উপস্থাপন করে, যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে রয়েছে পারস্পরিক সম্মান, মতভেদের সঙ্গে রয়েছে সহনশীলতা, অভিমানের সঙ্গে রয়েছে দ্রুত মিলনের আন্তরিকতা এবং সংকটের মাঝেও রয়েছে ধৈর্য ও ন্যায়বিচার। তিনি কখনো কঠোরতা দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করেননি; বরং কোমল আচরণ, সুন্দর ভাষা, সহমর্মিতা এবং প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয় জয় করেছিলেন।
আজকের যুগে পারিবারিক অশান্তি, ভুল বোঝাবুঝি ও বিচ্ছেদের সংখ্যা যখন বাড়ছে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংসার আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করতে পারলে দাম্পত্য জীবন হবে শান্তিময়, পরিবার হবে ভালোবাসা ও রহমতের নীড়, আর সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ।