সন্তান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলে মা-বাবার করণীয়

সন্তান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলে মা-বাবার করণীয়

ফাইল ছবি

সব সন্তান সব ক্ষেত্রে সফল হয় না। কেউ পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারে না। কেউ চাকরি পেতে বারবার ব্যর্থ হয়। কেউ ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়ে। আবার কেউ নিজের পছন্দের কাজে সফল হতে একটু বেশি সময় নেয়।

এমন সময়ে বাবা-মায়ের আচরণ সন্তানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতার পর তাকে আরও চাপে না ফেলে পাশে থাকা দরকার। ইসলামে সন্তানকে ভালোবাসা, কোমল আচরণ করা এবং সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করার শিক্ষা রয়েছে।

অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না

সন্তান আশানুরূপ ফল না করলে তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। ‘অমুকের ছেলে এত ভালো করেছে, তুমি পারলে না কেন?’ এ ধরনের কথা সন্তানের মনে কষ্ট দিতে পারে এবং এতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের ওপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না।’ (সুরা নিসা: ৩২)

প্রতিটি মানুষের যোগ্যতা ও সামর্থ্য এক নয়। তাই অন্যের সাফল্য দেখিয়ে সন্তানকে ছোট না করে তার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। সন্তানের নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া ভালো।

ব্যর্থতার জন্য অপমান নয়

একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল বা কোনো কাজে ব্যর্থতা সন্তানের পুরো জীবনের পরিচয় নয়। তাই এমন সময়ে তাকে অপমান করা, কটু কথা বলা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সামনে ছোট করা উচিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নম্রতা বা কোমলতা যেকোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর যেকোনো বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তা কলুষিত হয়। ’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯৪)

তাই সন্তানকে সংশোধন করতে হলেও কথাবার্তায় কোমলতা রাখা জরুরি।

আগে সন্তানের কথা শুনুন

সন্তান কেন সফল হতে পারেনি, সেটি জানার চেষ্টা করা দরকার। সে কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি? কোনো বিষয়ে বুঝতে সমস্যা হয়েছে? নাকি অন্যকোনো কারণে পিছিয়ে পড়েছে?

এসব না জেনে শুধু বকাঝকা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। সন্তানের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বললে তার সমস্যার কারণ জানা সহজ হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর-হৃদয় হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)

সন্তানের ভুল থাকলেও তার সঙ্গে কঠোর না হয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

‘লোকে কী বলবে’ ভাববেন না

সন্তানের ফল খারাপ হলে অনেক বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর মন্তব্য নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। অথচ মানুষের কথার চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ ও চরিত্র বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যের কাছে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য সন্তানকে অপমান করা উচিত নয়। ভুল থাকলে তা বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে সংশোধনের ভাষা হতে হবে ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার।

ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করুন

ব্যর্থতার পর শুধু ‘কেন পারলে না’ জানতে চাওয়ার চেয়ে কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা বেশি জরুরি।

কোথায় ঘাটতি ছিল, কী পরিবর্তন দরকার এবং পরেরবার কীভাবে আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়- এসব নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।

একবারের ব্যর্থতাকে শেষ হিসেবে না দেখে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে চেষ্টা করার সাহস দিতে হবে।

নতুন করে চেষ্টা করার সাহস দিন

সন্তান ব্যর্থ হওয়ার পর যদি মনে করে তার আর কিছু করার নেই, তখন বাবা-মায়ের উৎসাহ খুব প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)

তাই সন্তানকে বোঝাতে হবে, একটি ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়। নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ সবসময় আছে।

নিজের স্বপ্ন সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেবেন না

অনেক বাবা-মা নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। এতে সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

সন্তান কোন বিষয়ে আগ্রহী, তার যোগ্যতা কোথায় এবং কোন কাজে সে ভালো করতে পারে এসবও বিবেচনায় রাখা দরকার। ভালো ভবিষ্যৎ চাওয়া স্বাভাবিক। তবে নিজের ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সব সময় কল্যাণকর নয়।

সন্তানের জন্য দোয়া করুন

সন্তান ব্যর্থ হলে শুধু বকাঝকা নয়, তার জন্য দোয়াও করা উচিত। সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়: মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৬)

তাই সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। তাকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতেও শেখাতে হবে।

নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা

কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরার শিক্ষা নবীদের জীবনেও রয়েছে। হজরত ইয়াকুব (আ.) প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়েও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি।

সন্তানের সাময়িক ব্যর্থতার সময় বাবা-মায়েরও ধৈর্য রাখা দরকার। আজ যে সন্তান পিছিয়ে আছে, সে আগামী দিনে অন্যকোনো ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে।

সাফল্য শুধু ভালো ফল নয়

ভালো ফল, চাকরি, ব্যবসা কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এগুলোই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সন্তান সত্যবাদী কি না, দায়িত্বশীল কি না, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই সন্তান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলে তাকে ভেঙে দেওয়া নয়, নতুন করে দাঁড়াতে সাহায্য করাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব। একটি পরীক্ষার ফল সন্তানের পুরো জীবনের পরিচয় নয়। একটি ব্যর্থতাও তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। বাবা-মায়ের ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও দোয়া তাকে নতুন করে চেষ্টা করার সাহস দিতে পারে।