এক নৌকাতেই ২৩০ অভিবাসীর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি
ছবিঃ রয়টার্স
একটি মাত্র ছোট নৌকায় ২৩০ জনকে নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছেছেন অভিবাসীরা।সোমবার ভোরে ফ্রান্স থেকে আসা ওই নৌকাটি ব্রিটিশ উপকূলে পৌঁছানোর পর এক নৌকায় অভিবাসী আগমনের নতুন রেকর্ড হয়েছে। এর আগে গত ২৩ জুলাই একটি নৌকায় সর্বোচ্চ ১৬৫ জন চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। নতুন রেকর্ডটি তার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ফরাসি উদ্ধারকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের নৌকাটিতে ২০ জনেরও বেশি শিশু ছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া ছোট নৌকার সংখ্যা কমলেও প্রতিটি নৌকায় আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষকে তোলা হচ্ছে। শনিবার থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত প্রায় ৯১১ জন ছোট নৌকায় চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছেছেন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার চারটি নৌকায় ২৫৮ জন এবং রবিবার পাঁচটি নৌকায় ৪২৩ জন ব্রিটেনে পৌঁছেছেন। সোমবারের ২৩০ জন যোগ হলে তিন দিনে মোট সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ৪৭২ জন ছোট নৌকায় চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছেছেন। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর আগমনের সংখ্যা প্রায় ৪৩ শতাংশ কম।
নৌকা কমলেও বাড়ছে যাত্রীর সংখ্যা
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ছোট নৌকায় অভিবাসী বহনের ধরন বদলে গেছে। চলতি জুলাইয়ে প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৭২ জনের বেশি মানুষ ছিলেন, যা নতুন রেকর্ড। ২০২১ সালের জুলাইয়ে এই গড় ছিল ২৮ জন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে ছিল মাত্র ১১ জন।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে একই ধরনের নৌকায় যাত্রীর গড় সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাচারকারী চক্রগুলো সীমান্ত নজরদারি এড়াতে কমসংখ্যক নৌকায় যত বেশি সম্ভব মানুষ পাঠানোর কৌশল নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী এসব নৌকাকে ‘মেগা-ডিঙি’ বলা হচ্ছে।
তবে এতে ঝুঁকিও বাড়ছে। ইংলিশ চ্যানেল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ। প্রবল স্রোত, বাতাস, ঠান্ডা পানি এবং ছোট ও অনিরাপদ নৌকার কারণে এই পথে যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক। গত ৩০ জুলাই চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই আরেকটি নৌকায় আগুন লাগার পর শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়।
এক নৌকায় ২৩০ জনের আগমনের পর ফরাসি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও ব্রিটেনে প্রশ্ন উঠেছে। ফরাসি সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে একাধিক নৌকাকে সহায়তার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ব্রিটেনে পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অনেক যাত্রী উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানান।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, অতিরিক্ত মানুষে ঠাসা এসব নৌকা মাঝসমুদ্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। জোর করে যাত্রীদের উদ্ধারকারী জাহাজে তোলার চেষ্টা করলে নৌকার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেটি ডুবে যেতে পারে।
সরকারের ওপর বাড়ছে চাপ
নতুন রেকর্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ ঘটনাটিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টিও সরকারের সীমান্তনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে চলতি বছর ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসন গত বছরের তুলনায় কমেছে। একই সঙ্গে পাচারকারী চক্রগুলো আরও বেশি মানুষকে অনিরাপদ নৌকায় তুলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলেও সতর্ক করেছে সরকার।
ফ্রান্সের সঙ্গে সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করতে ব্রিটেন এপ্রিলে নতুন তিন বছরের একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় ফরাসি উপকূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং নৌকা পানিতে নামার আগেই মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও বৈধ পথে আশ্রয় চাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে সোমবারের ২৩০ জনের আগমন দেখিয়ে দিয়েছে, মোট নৌকা ও অভিবাসীর সংখ্যা কমলেও পাচারকারীরা এখন একেকটি নৌকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ তুলে দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল নিয়েছে। ফলে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি ঠেকাতে ব্রিটিশ ও ফরাসি কর্তৃপক্ষের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।