বিশ্ব হাতি দিবস আজ
সংগৃহীত ছবি
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আবদুর রহমান একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চালাতেন। ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে জোয়ারের পানিতে বছরে তিন-চারবার ঘরবাড়ি ডুবে যেত। এতে বেশ ক্ষতি হতো। স্থায়ী সমাধানে দুই বছর আগে পরিবার নিয়ে চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েন। স্থান বদলে পেশাও বদলেছে। ছয় সদস্যের পরিবার চালাতে এখন বনমুখী।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় পশ্চিম বড়ঘোনার মনসুর আলমও বসতি গড়েছেন চুনতি সংরক্ষিত বনে। এমন অন্তত ৮০টি পরিবারের বাস চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পূর্ব জঙ্গল চাম্বলের চুনতি সংরক্ষিত বনে। শুধু চাম্বল অংশে না, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর অংশে বনে বসতি গড়েছেন জলবায়ু উদ্বাস্তুরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হাতির আবাসভূমি।
বনে মানুষের উপস্থিতির কারণে খাদ্যসংকটে পড়েছে বন্যহাতিরা।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, সংরক্ষিত বনে বসতি গড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতি। হাতি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়েছে। সংকুচিত হয়েছে আবাসস্থল। উদ্বাস্তুরা গহিন বনে হাতির খাদ্যযোগ্য গাছপালা ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ শুরু করেছে।
তাই হাতি বাধ্য হয়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এই সংকট বাড়তে থাকলে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ার পাশাপাশি নষ্ট হবে পরিবেশের ভারসাম্য। ঘটবে পরিবেশ বিপর্যয়।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ ১২ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়—‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।’ হাতির বিলুপ্তি রোধ, সুরক্ষা এবং তাদের আবাসস্থল ধরে রাখার সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়।
প্রায় ১৯ হাজার একরের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রায় অর্ধেক অংশেই বাঁশখালী উপজেলায়। এ অভয়ারণ্যে দুটি রেঞ্জ ও সাতটি বিটের মধ্যে একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট এ উপজেলায়। এ উপজেলার পূর্বপাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতি চলাচলের করিডর।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১০২টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে মারা গেছে ১৪টি। বিশ্বজুড়ে হাতি ‘বিপন্ন’ তালিকায় থাকলেও বাংলাদেশে এটি ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতি। ১৯৮৬ সালে আইইউসিএন প্রাণীটিকে লাল তালিকাভুক্ত করে।
বাংলাদেশের বন অধিদপ্তর এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের (আইইউসিএন) মতে, হাতি ও মানুষের সংঘাতের মূল কারণ হাতির প্রথাগত চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’ ধ্বংস হওয়া। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
দেশে হাতি নিয়ে সরকারিভাবে তিনটি জরিপ হয়েছে। ১৯৮০, ২০০০ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে। হাতির সংখ্যা, বিচরণক্ষেত্র, চলাচলের পথ এবং বিলুপ্তি থেকে রক্ষায় এ জরিপ পরিচালিত হয়। বন বিভাগের প্রথম জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ৩৮০টি। প্রায় ২০ বছর পর ২০০০ সালে আবার হাতির জরিপ করে। তবে সে সময় ২৩৯টি হাতির সন্ধান পায় বন বিভাগ। সর্বশেষ ২০১৬ সালে জরিপ করা হয়। এ সময় এর সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ২৬৮টি।
স্থানীয় লোকজন জানায়, সংরক্ষিত বন আগে স্থানীয়রা দেখাশোনা করত। বন বিভাগের লোকজন তেমন আসত না। গত পাঁচ বছর থেকে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশে এ বনে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের বসতি শুরু করে। শুধু পূর্ব জঙ্গল চাম্বল সংরক্ষিত বনে ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার বসতি স্থাপন করেছে। এসব পরিবার বনের প্রায় ২০ একর জায়গা দখল করেছে।
স্থানীয় হাবিবুল্লাহ বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করলেও হাতি দ্বারা আক্রান্ত হইনি। কয়েক বছর ধরে চাষবাসে নতুন আতঙ্ক বন্যহাতি। গত সপ্তাহেও রাতের বেলা দলবেঁধে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত ধ্বংস করে।
স্থানীয় ফজল কাদের বলেন, হাতি এলে শিস দিয়ে সবাইকে এক করা হয়। এরপর আগুন জ্বেলে গহিন বনের দিকে হাতির পালকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন আর লোকালয় কাছাকাছি। উপকূলীয় এলাকার অনেকে বনের জমিতে বসতি স্থাপন করছে, যা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। হাতির বাসস্থান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং হাতিদের জন্য খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে।
বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী মনিরা পারভিন বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষ আর হাতির দ্বন্দ্ব বেড়েছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এতে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁর মতে, এভাবে পাহাড়ে মানুষের পুনর্বাসন হতে থাকলে হাতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরো বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক বন্যপ্রাণী ও হাতি গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, হাতির আবাসস্থল হচ্ছে বনাঞ্চল। সেই বনের যদি স্বাস্থ্য ভালো না থাকে, তাহলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসবে। হাতি ভালো রাখতে হলে নিরাপদ আবাসস্থল, পানি ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
গারো পাহাড়ে হাতি বেড়েছে, বেড়েছে ঝুঁকিও
গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে অবাধে গাছ কাটা, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন, বন দখল করে বসতি স্থাপনের ফলে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। তা ছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডার কমে গেছে। এর পরও শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে বেড়েছে বন্যহাতির সংখ্যা। কিন্তু খাবারের অভাবে প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে হাতি। এতে বেড়েছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের ঘটনা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছরে অন্তত ৫৫টি হাতির শাবকের জন্ম হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এর আগে গারো পাহাড়ে ১০০ থেকে ১২০টি বন্যহাতির বিচরণ লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে ১৮০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে।
বন কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গারো পাহাড়ে বন্যহাতির বংশবিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশ থেকে এশিয়ান প্রজাতির বন্যহাতির সংখ্যা দিন দিন কমছে বলে হাতি গবেষকরা উদ্বেগ জানালেও গারো পাহাড়ে আশার আলো দেখছেন বন কর্মকর্তারা। হাতির প্রতিটি পালে ছোট-বড় শাবক দেখা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি ড্রোন ক্যামেরায় বনের ভেতর ৩৪টি হাতির একটি পালে ৮ থেকে ১০টি বাচ্চা দেখা গেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম জানান, হাতি-মানুষের সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, বালিজুরি রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ