কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ফের ডুবল চট্টগ্রাম নগরী দুর্ভোগে মানুষ
সংগৃহীত ছবি
ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাসহ বিভিন্ন সড়ক ও এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গতকাল সোমবার ভোররাত থেকে টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
পোশাক ও তরিতরকারির অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারেও এবার মারাত্মক জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে নগরের আরো বিভিন্ন এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতেও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়।
জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন সড়ক ও উপসড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। দিনভর দুর্ভোগ ও ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী।
এ নিয়ে চট্টগ্রামে গত দেড় মাসের ব্যবধানে আবার জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামের প্রধান পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য মতে, গতকাল বিকেল ৩টার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৯৭.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত নগরের কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, মুরাদপুর, রিয়াজউদ্দিন বাজার, দক্ষিণ নালাপাড়া, বাদুরতলা, জামালখান, আইস ফ্যাক্টরি সড়ক, জিইসি মোড়, তিনপুলের মোড়, মেহেদিবাগ, পাঁচলাইশ মোড়, ফরিদার পাড়া, অক্সিজেন, বায়েজিদ সড়ক, উত্তর কাট্টলী, হালিশহর সড়ক, চকবাজার অ্যাকসেস সড়কসহ আরো কয়েকটি এলাকায় সড়ক, উপসড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
চকবাজার কাঁচাবাজার, তেলিপট্টি মোড় ও চক সুপারমার্কেট এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যায়।
সকাল ৯টার দিকে তরিতরকারি কেনার জন্য চকবাজারের কাঁচাবাজার যাচ্ছিলেন ফয়সাল মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি। সুপারমার্কেটের সামনে হাঁটুপানি দেখে তিনি আর বাজার করতে যাননি। তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে কী বাজার করব? দোকানগুলোতে পানি ঢুকেছে। বেচাকেনা বন্ধ।’
চক সুপারমার্কেটের নিচতলায় কোমর সমান পানি।
রিয়াজউদ্দিন বাজারেও পানি থইথই করছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আগে এত বেশি পানি ওঠেনি। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের বিপরীত পাশে রিয়াজউদ্দিন বাজারের কয়েকটি বইয়ের দোকানেও পানি ঢুকেছে। এতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এদিকে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ব্যাংক, বীমা, মার্কেটসহ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসায় মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।
দক্ষিণ নালাপাড়া ও আইস ফ্যাক্টরি এলাকায় কয়েকটি পয়েন্টে হাঁটু সমান পানি। এসব এলাকায় পানির অংশ পার হতে রিকশাগুলো যার কাছ থেকে যেভাবে পেরেছে সেভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ফোরকান আলী নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
চট্টগ্রামের প্রধান পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবের কারণে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল দুপুর ১২টার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ২০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টিপাত আগামী দু-তিন দিন হতে পারে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, সকালে বৃষ্টির পাশাপাশি জোয়ারের পানির কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি কমলে সকাল ১০টার পর থেকে পানি কমতে শুরু করে। হিজড়া খালের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ার কারণে কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলাসহ আশপাশের এলাকায় জলজট হয়েছে। সেখানেও পানি কমেছে। এবার রিয়াজউদ্দিন বাজারে পানি উঠেছে।
চার প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা : চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি বড়সহ মোট চারটি প্রকল্পে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। জানা যায়, এসব প্রকল্পের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন একটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেও অন্য তিনটির কাজ চলমান। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দুটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই তিনটি প্রকল্পের কাজও এখন প্রায় শেষের দিকে। এর পরও জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওই চারটি মেগাপ্রকল্পের নির্মাণকাজে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে এলেও চলতি বর্ষা মৌসুমে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন সড়ক ও এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রসঙ্গত, গত ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছিল নগরের প্রধান পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়। ওই সময়ও বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছিল চট্টগ্রামবাসী।