‘মরে গেলেই বাঁচি’ এমন ভাবনা এলে মুমিনের করণীয়

‘মরে গেলেই বাঁচি’ এমন ভাবনা এলে মুমিনের করণীয়

ফাইল ছবি

জীবন সবসময় সমান ছন্দে চলে না। কখনো আনন্দ এসে হৃদয় ভরিয়ে দেয়, আবার কখনো দুঃখ-কষ্টের একের পর এক ঢেউ মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে চায়।

প্রিয়জনের মৃত্যু, অসুস্থতা, দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা, পারিবারিক অশান্তি, ব্যর্থতা কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো দুশ্চিন্তায় মানুষ কখনো কখনো এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে—‘এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভালো।’

কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। সে জানে—জীবন যেমন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত, তেমনি বিপদ-আপদও তাঁর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আজকের অন্ধকার যে আগামী দিনের আলোকে আড়াল করে রেখেছে, মানুষ তা জানে না।

তাই সাময়িক কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মৃত্যু কামনা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং বিপদের মুহূর্তে মুমিনের কর্তব্য হলো সবর করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং কল্যাণকর জীবন কামনা করা।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষার জন্য। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যেমন পরীক্ষা, তেমনি দুঃখ-কষ্টও পরীক্ষা।

আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : বাকারা, ‌‌আয়াত : ১৫৫)

পরের আয়াতে আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘যখন তাদের ওপর কোনো বিপদ আসে, তখন তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৬)

দুঃখ-কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা করা কি জায়েজ?

সাধারণ দুঃখ-কষ্ট, বিপদ, অসুস্থতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা বা পার্থিব দুর্ভোগের কারণে মৃত্যু কামনা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদের কারণে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে।

’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৮০)

কারণ মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। যে পরিস্থিতিকে আজ অসহনীয় মনে হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

আজ যে মানুষটি কান্নায় ভেঙে পড়েছে, আগামীকাল হয়তো তার জীবনেই এমন কোনো দরজা খুলে যাবে, যা সে কল্পনাও করেনি। তাই সাময়িক কষ্টের ভিত্তিতে স্থায়ী মৃত্যুকে কামনা করা একজন মুমিনের জন্য উপযুক্ত নয়।

এমন পরিস্থিতিতে যে দোয়া পড়বেন

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের অসাধারণ একটি দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি সে অবশ্যই কিছু বলতে চায়, তবে বলবে :

اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي

‘হে আল্লাহ! যতদিন জীবন আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন এবং যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দান করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৮০)

এই দোয়ায় একজন মুমিন নিজের সিদ্ধান্তকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে। সে বলে না—‘আমি আর বাঁচতে চাই না’; বরং বলে—‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন কোনটি আমার জন্য কল্যাণকর।’

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও ছিল অসহনীয় দুঃখ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল। তবুও তাঁর জীবন ছিল পরীক্ষা ও বিপদে পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর সন্তানদের মৃত্যু দেখেছেন। তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুও তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। তায়েফে তিনি অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং রক্তাক্ত হয়েছেন। সাহাবিদের ওপরও নেমে এসেছিল নির্যাতনের পাহাড়। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও তিনি আল্লাহর ওপর আস্থা হারাননি। বরং বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর কাছেই ফিরে গেছেন।

বিপদ গুনাহ মোচনের মাধ্যম

আমরা অনেক সময় বিপদকে শুধু শাস্তি হিসেবে দেখি। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, মুমিনের জন্য কষ্টের মধ্যেও কল্যাণ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, দুঃখ, কষ্ট, দুর্ভাবনা, এমনকি যে কাঁটার আঘাতও আসে—এর মাধ্যমে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৩)

তাহলে যে কষ্টকে আমরা শুধু দুর্ভাগ্য মনে করছি, সেটিই হয়তো আমাদের গুনাহ ঝরিয়ে দিচ্ছে।

একটি অসুস্থতা হয়তো মানুষকে নামাজে ফিরিয়ে আনছে।
একটি ব্যর্থতা হয়তো তাকে অহংকার থেকে মুক্ত করছে।
একটি দুঃখ হয়তো তাকে গভীর রাতের তাহাজ্জুদে দাঁড় করাচ্ছে।
একটি বিপদ হয়তো তাকে এমনভাবে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে, যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে সে কখনোই ফিরত না।

তাই বিপদে শুধু ‘কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?’ না বলে মুমিনের উচিত ভাবা—‘এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আল্লাহ আমাকে কী শিক্ষা দিতে চান?’

বিপদে ধৈর্যের পুরস্কার

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অগণিতভাবে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১০)

সবর মানে কষ্ট অনুভব না করা নয়। চোখে পানি আসতে পারে, হৃদয় ভেঙে যেতে পারে, প্রিয়জনের বিচ্ছেদে কান্না আসতে পারে—এসব মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। সবর হলো—কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা, হারাম পথে না যাওয়া এবং তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না

মানুষ যখন দীর্ঘদিন কষ্টে থাকে, তখন শয়তান তার মনে হতাশার বীজ বপন করে। সে মনে করতে শুরু করে—‘আমার জন্য আর কোনো পথ নেই’, ‘আমার জীবন আর কখনো ভালো হবে না’, ‘আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন না।’ এমন চিন্তা থেকে মুমিনকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কোনো কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা : শারহ, আয়াত : ৫–৬)

একটি বিষয় লক্ষণীয়—আল্লাহ ‘কষ্টের পরে স্বস্তি’ বলেননি শুধু; বরং বলেছেন কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। অর্থাৎ অন্ধকারের মধ্যেও আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা থাকতে পারে।