হাত ঘুরলেই দাম বাড়ে ইলিশের

হাত ঘুরলেই দাম বাড়ে ইলিশের

সংগৃহীত ছবি

জালে কম ধরা পড়া ছাড়াও মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারদের চক্রের কারণে ইলিশ মাছের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলছে। নদী ও সমুদ্র থেকে শিকারের পর ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে ইলিশকে কমপক্ষে ছয়বার হাতবদল করাতে হয়।

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি স্তরে মূল্য পরিবর্তন ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণে নদীর সস্তা ইলিশ সাধারণ মানুষের কাছে দুর্মূল্যের বস্তু হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।

জেলেরা জানিয়েছেন, তাঁরা আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে অগ্রিম দাদন নেওয়ায় সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আড়তদারদের কাছে রয়েছে। সর্বপ্রথম জেলেদের কাছ থেকে ইলিশ চলে যায় স্থানীয় আড়তদারদের হাতে। সেখান থেকে পাইকারি মোকামে ওঠানো হয়।

পাইকারি মোকাম থেকে ইলিশ চলে যায় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে। সর্বশেষ যখন খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছায় তখন ইলিশের দাম এমন পর্যায়ে ওঠে যে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। প্রতিটি স্তরে হাতবদলের কারণে প্রতি কেজিতে ইলিশের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর জেলে হিরাসপাতা বলেন, ‘আমরা এক কেজির বড় ইলিশ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করি।

তা শহরের বাজারগুলোতে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়। পোর্ট রোড পাইকারি ইলিশ বাজার সমিতির সভাপতি জহির সিকদার বলেন, রবিবার (গতকাল) বরিশাল পোর্ট রোড পাইকারি মোকামে এক কেজি আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে, যা খুচরা বাজারে আরো ৩০০ টাকা বেশি। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম আকারের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে দুই

হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, যা খুচরা বাজারে কেজিতে আরো ২৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ছোট আকারের (৪০০-৫০০ গ্রাম) ইলিশ প্রতি কেজি পাইকারি বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা কেজিতে, যা খুচরা বাজারে আরো ২০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়েছে।

মেঘনার ইলিশবাজার চক্রের কবজায় : জানা গেছে, মেঘনা নদীর ইলিশের স্বাদ সাগর কিংবা অন্য নদীর মাছের চেয়ে বেশি।

এ কারণে এই ইলিশের চাহিদা ক্রেতাদের কাছে বেশি। আর এই সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র। নদী থেকে জেলেদের জালে ধরা পড়ার পর মাছঘাটের আড়ত হয়ে ব্যাপারীর হাত ঘুরে খুচরা বিক্রেতা হয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছায় এই ইলিশ। এতে প্রতি হাতেই দাম বেড়ে ক্রেতা পর্যন্ত তা তিন-চার গুণ হয়ে যায়। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। নদী ও সাগরের মাছ কেনাবেচার জন্য কমলনগরে ছয়টি ও রামগতিতে ১০টিসহ ১৬টি মাছঘাট রয়েছে। মেঘনা নদীর জেলেদের জালে ধরা পড়া ইলিশ প্রথমে এসব মাছঘাটে ওঠে। নিলামে বিক্রির মাধ্যমে সেখান থেকেই শুরু হয় রুপালি ইলিশের বাণিজ্যিক যাত্রা। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাপারীদের শক্তিশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইলিশের বাজার। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণত ওজন করে নয়; বরং হালি বা পিস হিসেবে নিলামে বিক্রি হয় ইলিশ। নদী থেকে মাছ নিয়ে আসা জেলেরা যে দামে ইলিশ বিক্রি করেন, পরে একই মাছ আড়তদার ও খুচরা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, তার মধ্যে রয়েছে বড় ফারাক। জেলের হাত থেকে যে দামে মাছ বিক্রি হয়, আড়ত, পাইকার ও খুচরা বাজারে কয়েক ধাপ পেরিয়ে দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ঘাটের আড়তে এখন এক কেজি ওজনের ইলিশ তাঁরা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। সেই মাছ বিভিন্ন হাত বদল হয়ে ভোক্তাদের কাছে পাঁচ হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়। মেঘনায় ইলিশ ধরতে জেলেদের বড় একটি অংশ আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ ধরে। ফলে মাছ ধরে আড়তে আনার পর দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

আলেকজান্ডার সেন্টারঘাটের জেলে হাসিম মাঝি বলেন, ‘দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ইলিশ শিকার করি। কষ্টের সেই ইলিশ নামমাত্র মূল্যে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছি।’ জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মাছঘাটে ইলিশ বিক্রি হওয়ার পর পাইকার ও খুচরা পাইকাররা ইলিশের দাম বাড়িয়ে দেন। এতে ইলিশ মাছ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এসব নিয়ন্ত্রণে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে।

বিষখালীতে ইলিশসংকটে দাম দ্বিগুণ : স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার বেতাগী বিষখালী নদীতে এবার জেলেদের জালে কম ইলিশ ধরা পড়ছে। সরেজমিনে পৌর শহরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের প্রতি কেজি ইলিশের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। আর এক কেজি ওজনের ইলিশ দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দুই কেজি বা তার চেয়ে একটু বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ গ্রেডের (বড় সাইজের) ইলিশের দাম ১০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষক রাজাংশু হালদার বলেন, ‘বাড়িতে মেহমান এসেছে। ইলিশ মাছ কিনতে হবে, কিন্তু দাম অনেক বেশি। দুটি মাছে এক কেজি হয়, এ ধরনের চারটি মাছের দাম নিয়েছে দুই হাজার ৬০০ টাকা।’ বেতাগী উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন মিনার বলেন, ‘সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বেশি হওয়ায় এখন ইলিশের দাম বেড়েছে।’