যুদ্ধের ধাক্কায় অর্ধেকে নেমেছে কর্মী রপ্তানি
ফাইল ছবি
বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে গত কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে গত ছয় মাসে কর্মী রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাকি শ্রমবাজারগুলোর পরিস্থিতিও একই। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক আয়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে। সংকট নিরসনে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, জ্বালানি তেল ও জাহাজ চলাচল খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে যেসব দেশ নতুন নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছিল, তারা অনেক কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সংকুচিত করেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিদেশে কর্মী রপ্তানি বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন কর্মী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছিলেন। অথচ চলতি বছরে এ সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৪ জনে। কর্মী রপ্তানি কমায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরব। একই অবস্থা কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও। আঞ্চলিক যুদ্ধের ফলে দেশগুলোর নির্মাণ খাত ও ভারী শিল্পে নতুন কাজের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গত ছয় মাসে সৌদি আরবে গেছেন মাত্র ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫ জন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে দেশটিতে পাঠানো হয়েছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ জন কর্মী। ফলে এক বছরে দেশটিতে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোতেও। কাতারে গত বছর ৫৬ হাজার ৯৬ জন কর্মী গেলেও এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০৩ জনে। কুয়েতে ২৭ হাজার ৮৬ জন থেকে কমে ১৩ হাজার ৭৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারে। গত বছর দেশটিতে যেখানে মাত্র ৬ হাজার ৭৮৯ জন কর্মী গিয়েছিলেন সেখানে চলতি বছরে গেছেন ১৪ হাজার ৮৭৫ জন।
এদিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এ সংকটের পেছনে তিনটি বিষয়কে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মীর চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি বিমান ভাড়া এবং অন-অ্যারাইভাল প্রশাসনিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সির খরচ অনেক বেড়ে গেছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, স্থানীয় সীমান্ত নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সেখানেও সংকট দেখা দিয়েছে।
এজন্য বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কর্মী রপ্তানির এই ধস সামাল দিতে বাংলাদেশকে এখন একক বাজারকেন্দ্রিক নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভর না করে কারিগরি ও আইটিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে বৈশ্বিক যেকোনো সংকটেও শ্রমবাজার তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। নীতিনির্ধারণী জায়গায় শ্রমবাজারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো বা বিকল্প বাজার তৈরির মতো কাঠামোগত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। ফলে বড় কোনো সংকট এলে বাংলাদেশকে সরাসরি ধাক্কা খেতে হচ্ছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অঞ্চলটিতে থাকা শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও বেতন নিয়মিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও অস্থিরতার পর পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ শুরু হলে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করে সরকার।
বৃহস্পতিবার সংসদে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানান, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করেছেন। এরপর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী দেশটি সফর করেন। এর ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র ইস্যু করেও শেষ মুহূর্তে স্থগিত করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।