অনর্থক কথা বললে কি সওয়াব নষ্ট হয়?

অনর্থক কথা বললে কি সওয়াব নষ্ট হয়?

প্রতীকী ছবি।

দৈনন্দিন জীবনে যেসব বিষয় আমাদের আমলনামা ও আত্মিক প্রশান্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত ও অনর্থক কথাবার্তা। নির্দোষ অনর্থক কথা পাপ নয়, শুধু অনর্থক কথার কারণে ইবাদতের সওয়াব নষ্ট হয় না। কিন্তু আমাদের অনর্থক অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো বেশিরভাগ সময়ই নির্দোষ হয় না। বরং সেখানে গিবত, মিথ্যা, অপবাদ, অন্যের মনে আঘাত দেওয়া-সহ নানা পাপাচার ঢুকে যায় যা আমাদের পাপের বোঝা ভারি করে, ইবাদতের সওয়াব নষ্ট করে, আমাদের আত্মা কলুষিত করে, অন্তরের প্রশান্তি নষ্ট করে।

একজন মানুষের ইমানি সৌন্দর্যের অন্যতম পরিমাপক হলো তার অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকা। সুন্নাহর গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষায় এর স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের ইসলাম পালনের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, যা তার কোনো কাজে আসে না তা বর্জন করা।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৩১৭) অনর্থক আড্ডা, ভিত্তিহীন আলোচনা কিংবা অহেতুক কৌতূহলে সময় কাটানো কেবল জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় ঘটায় না, বরং মানুষের চিন্তাজগৎকে আল্লাহমুখী করার পরিবর্তে পার্থিব মলিনতা ও পঙ্কিলতায় ঢেকে দেয়।

প্রতিটি উচ্চারিত শব্দের যে হিসাব দিতে হবে তা আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (তা লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত।’ (সুরা ক্বাফ: ১৮) এই চিরন্তন বার্তা মানুষকে নিজ উচ্চারিত শব্দ সম্পর্কে চূড়ান্ত সচেতন হতে শেখায়। মুখে উচ্চারিত অবহেলাভরে বলা একটি বাক্যও যে আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে এবং পরকালে তার হিসাব দিতে হবে, এই অনুভূতির জাগরণই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বাক্যব্যয় থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে।

জবান সংবরণের এই আত্মনিয়ন্ত্রণ একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখেরাতে নাজাতের অন্যতম চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে। হাদিস শরিফে হয়েছে, ‘যে নীরব থাকে, সে মুক্তি পায়।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৫০১) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তাঁর কাছে নিজের জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের দায়িত্ব নেবে, তিনি স্বয়ং তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। (সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪) কারণ জিহ্বার প্রভাবে সৃষ্ট অনর্থ, সম্পর্কচ্ছেদ এবং অপবাদ সমাজ ও পরকালের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।

জিহ্বার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পরিণতি কত মর্মান্তিক হতে পারে, তা প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস থেকে অনুধাবন করা যায়। একদিন রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কাছে এক নারীর নফল ইবাদত, দান-সদকা ও রোজার প্রশংসার পাশাপাশি উল্লেখ করা হলো যে, সে নিজের মুখের কথায় বা খারাপ আচরণে প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। এ কথা শুনে বিশ্বনবী স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করলেন, ‘সে জাহান্নামী।’ (মুসনাদে আহমদ: ৯৬৭৫) অর্থাৎ হাজারো নফল ইবাদতের পরও কেবল জিহ্বার অনিষ্টতা ও অনর্থক বাক্যালাপের কুপ্রভাব একজন মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।

অনর্থক কথা ও জিহ্বার অপব্যবহার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারলে তা আত্মিক নিরাপত্তার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হয়ে উঠতে পারে। পার্থিব জীবনের অহেতুক বিবাদ, ফিতনা ও আত্মিক অবক্ষয় থেকে বাঁচতে হলে নীরব থাকার অভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় কথা বা উত্তম বাক্যের বাইরে জিহ্বাকে সংযত রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য।