‘হিটলার ছিলেন অলস, ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরে
ফাইল ছবি
নিজের আর্ট কালেক্টিভ ‘সেন্টার ফর পলিটিক্যাল বিউটি’-র মাধ্যমে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন তিনি। কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-র এক নেতার বাড়ির পাশেই বানিয়ে ফেলেছিলেন হোলোকাস্ট মেমোরিয়ালের হুবহু এক প্রতিকৃতি।
সেই ফিলিপ রুখ এবার নাৎসিদের ক্ষমতায় আসার ইতিহাস নিয়ে লিখে ফেলেছেন এক নতুন বই। ১৯৩২ সালের নির্বাচন, রাইখস্টাগের অগ্নিকাণ্ড কিংবা ১৯৩৩ সালের বিতর্কিত ‘এনেবলিং অ্যাক্ট’ নিয়ে নতুন করে আর কী-ই বা জানার থাকতে পারে?
জার্মানি যখন একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ ছিল, তখন কীভাবে হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি (এনএসডিএপি) ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলো, তা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই বদলে গেছে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ। একই সঙ্গে উঠে এসেছে বহু চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯২৮ সালের নির্বাচনে নাৎসিরা পেয়েছিল মাত্র ৮ লাখ ভোট আর ১২টি আসন।
কিন্তু ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪ লাখ ভোট এবং ১০৭টি আসনে! মাত্র দুই বছরে ৯ গুণ বৃদ্ধি। রাতারাতি একটি প্রান্তিক বর্ণবাদী রাজনৈতিক দল পরিণত হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে।
‘হিটলার ছিলেন এক আলসে অপরাধী’
সাধারণত ধারণা করা হয়, হিটলারের মোহনীয় ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমার কারণেই জার্মান জনগণ তার দিকে ঝুঁকেছিল। তবে ১৯৩০ সালের নির্বাচনের আগের তথ্য-উপাত্ত ভিন্ন কথা বলে।
তখন হিটলারের নিজের দলই তাকে নিয়ে খুব একটা প্রচার চালায়নি। কারণ, তিনি জার্মানির নাগরিকই ছিলেন না, বরং অভ্যুত্থান চেষ্টার অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এক বিদেশি নাগরিক ছিলেন, যাকে যেকোনো সময় দেশছাড়া করার ঝুঁকি ছিল।
এমনকি নাৎসিদের প্রচার প্রধান জোসেফ গোয়েবলস ১৯৩০ সালে হিটলারের ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে চরম বিরক্ত ছিলেন। গোয়েবলসের ডায়েরির পাতা থেকে জানা যায়, হিটলার তখন দলের সদর দপ্তরে না গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ক্যাফে কিংবা সিনেমা হলে সময় কাটাতেন, আর দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতেন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত হিটলার কোনো রাজনৈতিক মহাপুরুষ ছিলেন না, ছিলেন দুপুরে ঘুম থেকে ওঠা এক অলস অপরাধী।
নাৎসিদের উত্থানের পেছনে গোয়েবলসের জাদুকরী প্রচারণাকে দায়ী করা হলেও, ১৯৩০ সালের আগের নাৎসি সাময়িকী বা পত্রিকার মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের ও অপেশাদার। তৎকালীন অন্য প্রভাবশালী দলগুলোর মতো তাদের বড় বাজেটের প্রচারণা ছিল না।
অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিটের ধস বা মহামন্দাকেও এককভাবে নাৎসিদের ৯ গুণ উত্থানের কারণ বলা যায় না। কারণ, জার্মানিতে অর্থনৈতিক ধস এবং ব্যংকিং খাতের আসল বিপর্যয় ঘটেছিল ১৯৩১ সালের মাঝামাঝি সময়ে—নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস পর। এমনকি যেসব অঞ্চলে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ছিল, সেখানে নাৎসিদের ভোট পাওয়ার হার ছিল তুলনামূলক কম। তরুণ ভোটাররাও শুরুতে নাৎসিদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
তবে কেন ১৯৩০ সালে নাৎসিদের এই অভাবনীয় জয়? উত্তরটি নির্মম। রাজনীতিতে নাৎসিদের মূল কৌশল বা বক্তব্যই ছিল রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যা ও দমন করা। আর এই সহিংসতার প্রবৃত্তিই তৎকালীন সমাজকে এক বিষাক্ত আকর্ষণে টেনেছিল।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি আশঙ্কাজনক। উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর কেলেঙ্কারি বা বিতর্ক তাদের খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না, বরং তারা আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে, উগ্র রাজনৈতিক বক্তব্য ও সহিংস পরিকল্পনা যখন সমাজকে বিষাক্ত করে তোলে, তখন গণতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়ে।