ঢাকার আবাসনের ভবিষ্যৎ সবুজ ও সাশ্রয়ী
ফাইল ছবি
বুড়িগঙ্গার তীরের বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে আজকের মহানগরী-ঢাকার ইতিহাস পরিবর্তন ও অভিযোজনের ইতিহাস। ১৬১০ সালে মোগল বাংলার রাজধানী হয়ে ওঠা শহরটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে আজ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র। মানুষের সুযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠার পাশাপাশি ঢাকা এখন সবার জন্য নিরাপদ, বসবাসযোগ্য ও সাধ্যের মধ্যে আবাসন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ঢাকার আবাসন সংকট শুধু বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যার সংকট নয়। বাসস্থানের অবস্থান, আলো-বাতাস, মৌলিক সেবা এবং মাসিক ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কম ভাড়ার বাসা কর্মস্থল থেকে দূরে হলে যাতায়াতের খরচ সেই সাশ্রয় কমিয়ে দেয়। আবার অপরিকল্পিত ভবনে অতিরিক্ত গরম, বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার ও ঘন ঘন মেরামত পরিবারের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপায়।
৫ অক্টোবরের বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’।
তাই সবুজ ও সাশ্রয়ী আবাসনের আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আবাসনকে মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে নির্মাণমূল্য বা ভাড়ার পাশাপাশি সেখানে বসবাসের দীর্ঘমেয়াদি খরচও কমাতে হবে। ভালো সবুজ নকশা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ।
সাশ্রয়ের জন্য বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি
সবুজ ভবন মানেই ব্যয়বহুল ভবন-এ ধারণা বদলানো প্রয়োজন। ভবনের অভিমুখ, জানালার বিন্যাস, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, ছায়া এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপযুক্ত উপকরণ শুরুতেই বিবেচনা করলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। কিছু ব্যবস্থায় বাড়তি প্রাথমিক বিনিয়োগ লাগলেও কম বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ সাশ্রয় দীর্ঘ মেয়াদে তা পুষিয়ে দিতে পারে। ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের গবেষণা পর্যালোচনাও এ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
এখানেই জীবনচক্র ব্যয়ের গুরুত্ব। একটি পরিবারের প্রকৃত আবাসন ব্যয় হলো ফ্ল্যাটের দাম বা ভাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, পরিচর্যা ও ভবিষ্যতের মেরামতের খরচ। শুরুতে কম খরচের ভবন ব্যবহারকালে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা তৈরির শুরুতে ক্রেতা, বাড়ির মালিক ও নির্মাতাদের সামনে এই পুরো হিসাব তুলে ধরতে হবে। দেশীয় প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় ও সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ করলে আস্থা বাড়বে।
দেশীয় Green Building কাঠামো ও রাজউকের প্রণোদনা
বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী মূল্যায়নের জন্য হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা এইচবিআরআই তৈরি করেছে HBRI-DESH Framework। ইউএনইপির বৈশ্বিক কর্মসূচির আওতায় এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় বা ইউএনওপিএস। DESH (দেশ)-এর পূর্ণরূপ Design for Environment and Sustainable Habitats। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, দুর্যোগ ঝুঁকি, স্থানীয় উপকরণ ও আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। DESHboard নকশা ও মূল্যায়নে সহায়তা করে। কাঠামোটি কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, তা পর্যালোচনা করছে ইউএন-হ্যাবিট্যাট।
রাজউকের সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপেও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সনদসহ শর্ত পূরণকারী সবুজ ভবনের জন্য সর্বোচ্চ ০.৫ অতিরিক্ত এফএআর পাওয়া যেতে পারে। এফএআর হলো জমির আয়তনের তুলনায় ভবনের মোট গণনাযোগ্য মেঝের আয়তনের অনুপাত। সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রেও অপরিকল্পিত এলাকায় A3 (অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট বাড়ি) ও A6 (সাশ্রয়ী আবাসন) মিশ্র ব্যবহারে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ ০.৫ অথবা ০.৭৫ অতিরিক্ত এফএআরের সুযোগ রয়েছে। প্রথমটির জন্য অন্তত ১০ কাঠা জমিতে নির্ধারিত আয়তনের পাঁচটি ইউনিট এবং দ্বিতীয়টির জন্য অন্তত ২০ কাঠা জমিতে মোট ফ্লোর স্পেসের ৫ শতাংশ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। সাশ্রয়ী আবাসনের এ দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি প্রযোজ্য হবে।
ডেভেলপার ও বাড়ির মালিকদের এসব সুযোগ মূল্যায়ন করা উচিত। পুরোনো বাড়ির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বা রেট্রোফিটের মাধ্যমে সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভবনের ধরন ও প্রযোজ্য শর্ত অনুযায়ী HBRI-DESH Framework-এ মূল্যায়ন কিংবা EDGE ও LEED--এর মতো আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে সবুজ সনদায়নের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
স্মার্ট সবুজ আবাসন (গ্রিন বিল্ডিং)
স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী পরিবেশবান্ধব ভবন (গ্রিন বিল্ডিং) এমনভাবে নকশা ও নির্মাণ করা হয় যাতে এর পুরো জীবনচক্রজুড়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা যায়। এ ধরনের ভবন কম শক্তি ও পানি ব্যবহার করে, গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমায়, নির্মাণসামগ্রীর দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং ভবনের ভিতরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলে। ঢাকার প্রেক্ষাপটে-যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, বায়ুদূষণ এবং শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা ‘আরবান হিট’ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়-সেখানে টেকসই নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ভবন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রতি বছর রাজউকের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১০ হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন প্রদান করা হয়ে থাকে। ওই ভবনসমূহের মধ্যে ১০ শতাংশ ভবনও যদি গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়, যা সবুজ আবাসন নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় কম-কার্বন নিঃসরণকারী পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন বিল্ডিং’ নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রচলিত নির্মাণ পদ্ধতির তুলনায় জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রাথমিক খরচ বেশি হতে পারে। এ ছাড়া ডেভেলপার, ভবন-মালিক এবং ভোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতারও কিছুটা অভাব রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী তৈরি এবং ফার প্রণোদনাসহ নিম্ন সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এ খাতকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
উদাহরণ তৈরি করুক বড় প্রতিষ্ঠান
বড় ডেভেলপাররা তাদের নকশা দল, ক্রয়ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যম আয়ের আবাসনেও সবুজ নির্মাণের উদাহরণ তৈরি করতে পারেন। সরকারি আবাসন, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও কার্যালয়েও জীবনচক্র ব্যয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এসব প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ও ব্যবহারকালীন সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ করলে অন্যরাও অনুসরণ করার বাস্তব ভিত্তি পাবেন।
ব্যাংক ও তহবিলদাতাদের উপযোগী ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি নির্ধারণের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি সুবিধা থাকলেও সীমিত আয়ের পরিবার বাড়তি প্রাথমিক ব্যয় বহন করতে না-ও পারে; অর্থায়ন সেই ব্যবধান কমাতে পারে। নতুন আবাসনের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের দক্ষতা বাড়ানোর সংস্কারকাজেও সহায়তা প্রয়োজন।
কার্বন কনশাস নগর নকশায় তরুণদের ভাবনা
সবুজ ও সাশ্রয়ী নগরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের ভাবনা আশাব্যঞ্জক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে রাজউক, ইউএনওপিএস ও ইউএনইপির যৌথ ‘কার্বন কনশাস আরবান ডিজাইন আইডিয়া কম্পিটিশন’ শিক্ষার্থীদের টেকসই জনপরিসর নিয়ে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। স্থানীয় ও পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ, সবুজায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সবার ব্যবহারযোগ্য স্থান নিয়ে তাঁদের ধারণাগুলো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখায়।
রাজউক ও ইউএনওপিএসের এই সহযোগিতা প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীদের ভাবনায় উঠে এসেছে, পরিবেশবান্ধব জনপরিসর তৈরিতে সব সময় ব্যয়বহুল প্রযুক্তি প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য নকশা সীমিত সম্পদেও ভালো নগরপরিসর তৈরি করতে পারে। এসব ধারণার ব্যয় ও নির্মাণযোগ্যতা যাচাই করে বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আগামী দিনের ভবন নিয়ে সিদ্ধান্ত আজই : Global Status Report for Buildings and Construction ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বে যে ভবনসমষ্টি থাকবে, তার প্রায় অর্ধেক এখনো নির্মিত হয়নি। দ্রুত নগরায়ণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। আজকের নকশা ও নির্মাণ সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের সম্পদ ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং মানুষের ব্যয় নির্ধারণ করবে।
সেই সুযোগ কাজে লাগাতে এখনই সচেতনতা, দেশীয় কাঠামোর প্রয়োগ, প্রণোদনার ব্যবহার এবং বাস্তব উদাহরণ তৈরিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিক নকশা, মানসম্মত নির্মাণ ও কার্যকর পরিচালনার মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। সবুজই সাশ্রয়ী।
মো. আশরাফুল ইসলাম, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, রাজউক।
শাইখ মোহামদ আলাভী, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস)।