শিক্ষককে সম্মান দিন, শিক্ষা নিজেই উঠে দাঁড়াবে!

শিক্ষককে সম্মান দিন, শিক্ষা নিজেই উঠে দাঁড়াবে!

জাকিরুল ইসলাম

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর এলে আমরা শিক্ষকদের নিয়ে বক্তৃতা দিই, ফুল দিই, ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানাই। পরদিন থেকে সবকিছু আগের মতোই চলে। অথচ দিনটির জন্ম আনুষ্ঠানিকতার জন্য হয়নি। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো ও আইএলও শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণ করে। সেখানে শিক্ষকতাকে মর্যাদাপূর্ণ পেশা বলে স্বীকার করে শিক্ষকের জীবনমান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলা হয়েছিল। সেই অঙ্গীকার স্মরণ করতেই ১৯৯৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়। অর্থাৎ এ দিন উদ্‌যাপনের চেয়েও বেশি জবাবদিহির। প্রশ্ন একটাই: আমরা কথা রেখেছি কি?

বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থী পাস করছে, জিপিএ-৫ বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও নৈতিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। এর দায় আমরা প্রায়ই শিক্ষকের ঘাড়ে চাপাই। কিন্তু যে ব্যবস্থায় নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বেতন, পদোন্নতি ও মর্যাদা কোনোটাই যথাযথ নয়, সেখানে শুধু শিক্ষককে দোষ দেওয়া সহজ, কিন্তু সৎ নয়। সত্য হলো, মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চায় না, আর যারা আসে তাদের অনেকে সুযোগ পেলেই অন্য পেশায় চলে যায়। একই যোগ্যতায় অন্যত্র বেতন, সুযোগ ও সামাজিক স্বীকৃতি বেশি। যে পেশা সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দেয় না, সেখানে সেরা প্রতিভা থাকবে কেন?

শিক্ষকের বঞ্চনা কেবল বেতনে সীমাবদ্ধ নয়। সীমিত আয়ে শহরে পরিবার চালানো, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বার্ধক্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেই, কর্মজীবনের অগ্রগতির পথ অস্পষ্ট। পাঠদানের বাইরে তথ্য সংগ্রহ, জরিপ, নির্বাচন ও উপবৃত্তির হিসাবের বোঝা তাঁকে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সমাজেও একসময়ের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষটিকে আজ অনেক সময় মাপা হয় কোচিং, পরীক্ষার ফল আর ভাইরাল ভিডিও দিয়ে। মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচতেই যাঁকে সংগ্রাম করতে হয়, তাঁর কাছে সৃজনশীল ও আধুনিক পাঠদান প্রত্যাশা করা কি ন্যায়সংগত?

বরাদ্দ আছে, অগ্রাধিকার নেই:

এর পেছনে রয়েছে নীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা। প্রশ্নটা শুধু বরাদ্দ কম কি না, তা নয়; যা বরাদ্দ হচ্ছে তা কোথায় যাচ্ছে এবং কার স্বার্থে যাচ্ছে, সেটিও। শিক্ষা খাতের অর্থ ব্যয়ের অগ্রাধিকার প্রায়ই নির্ধারিত হয় প্রয়োজন দেখে নয়, কোথায় ব্যয় বেশি আর কোথায় সুবিধা বেশি, তা দেখে। একটি উদাহরণ ভবন নির্মাণ। যেখানে নতুন ভবনের প্রয়োজন নেই বা বিদ্যমান ভবনই যথেষ্ট, সেখানেও ভবন হয়, কারণ নির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দ বড় এবং সেই বড় অঙ্কে ভাগ বসানোর সুযোগ বেশি। অভিযোগ আছে, এই অর্থের একটি অংশ কমিশন হয়ে অন্যের পকেটে যায়। অথচ সেই টাকায় শ্রেণিকক্ষের আসবাব, ল্যাব, গ্রন্থাগার বা শিক্ষকের প্রশিক্ষণ হতে পারত।

নির্বিচারে সব প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে টিফিন দেওয়ার উদ্যোগও এই ভারসাম্যহীনতার আরেক দৃষ্টান্ত। পুষ্টির প্রয়োজন যাঁদের সবচেয়ে বেশি, লক্ষ্য ঠিক করে তাঁদের কাছে পৌঁছালে এটি হতো কার্যকর। সবার জন্য একসঙ্গে চালু করতে গিয়ে সীমিত সম্পদ ছড়িয়ে পড়ছে, বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, আর যথাযথ তদারকির সক্ষমতাও তৈরি হয়নি। একই প্রবণতা দেখা যায় বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে, যেগুলোর বিপুল বরাদ্দ ফলের চেয়ে অপচয়ের জন্যই বেশি আলোচিত।

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রশিক্ষণ নিঃসন্দেহে ভালো এবং জরুরি। কিন্তু অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ হয় কাগজে, আর বরাদ্দ খরচ হয় ভ্রমণ ও আনুষঙ্গিক খাতে। সেখানে শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ে না, শুধু হিসাবের খাতা ভরে। উপবৃত্তি ও বিনামূল্যের বই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; এগুলো ঝরে পড়া কমিয়েছে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানকে স্কুলে এনেছে। আমি এর বিরোধী নই। আমার প্রশ্ন লক্ষ্যমুখিতা, স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য নিয়ে। কারণ বই হাতে পেলেই শেখা হয় না, শেখান শিক্ষক।

উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, বেতন নিম্নস্তরের:

যে শিক্ষকের জন্য বিনিয়োগ সবচেয়ে জরুরি, তাঁর বেতন কাঠামোই সবচেয়ে অবহেলিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষক এখন অনার্স-মাস্টার্স পাস, অথচ তাঁদের বেতন নির্ধারিত হয় ১৩তম গ্রেডে। উচ্চতর গ্রেড পেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে সর্বোচ্চ ১১তম গ্রেডে যাওয়া যায় বটে, কিন্তু দুই ধাপের আর্থিক ব্যবধান এতই সামান্য যে এই পরিবর্তন প্রায় কোনো কাজেই আসে না। তার ওপর এই সুযোগটিও সহজে মেলে না, আদায় করতে হয় দীর্ঘ জটিলতা পেরিয়ে।

ফলে উচ্চশিক্ষিত একজন শিক্ষক বেতনের বিচারে দাঁড়িয়ে যান সরকারি নিম্নশ্রেণির কর্মচারীদের সারিতে। এই বাস্তবতা তাঁর মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। যে টাকা পান, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। বাধ্য হয়ে অনেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশা বা আয়ের পথ খোঁজেন এবং সেদিকেই সময় ও মনোযোগ দেন। এ সমস্যা কেবল প্রাথমিকের নয়; সব স্তরের শিক্ষকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম, তাই এই প্রবণতা সর্বত্রই কমবেশি আছে।

এর মাশুল দেয় শ্রেণিকক্ষ। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসেন, এমন শিক্ষক এখন কম। প্রস্তুতিহীন ক্লাসের মান ভালো হয় না, শিক্ষক ভালো পড়াতে পারেন না, শিক্ষার্থীও ভালো শেখে না। অর্থাৎ শিক্ষকের বেতন নিয়ে কার্পণ্যের দাম শেষ পর্যন্ত দিতে হয় শিক্ষারই ক্ষতি দিয়ে। এই শিক্ষকদের ক্লাসে মনোযোগী হতে বলার আগে প্রশ্ন করতে হবে, তাঁদের সংসারে মনোযোগী হওয়ার মতো নিশ্চয়তা আমরা দিয়েছি কি?

নিয়োগে যোগ্যতা নয়, প্রভাবই মুখ্য?

শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে সমস্যা আরও গভীর। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব যে ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে, তার নেতৃত্বে প্রায়ই থাকেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিরা। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। সেখানে প্রশ্ন ওঠে না যোগ্যতার, চলে লেনদেনের হিসাব। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ এখন প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়। এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধাভিত্তিক নিয়োগের যে উদ্যোগ চলছে, তাকেও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টার কথা শোনা যায়। যে শিক্ষক টাকা দিয়ে চাকরি পান, তিনি শ্রেণিকক্ষে নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন কোন জোরে? আর যিনি মেধায় যোগ্য হয়েও বাদ পড়েন, তাঁর হতাশার দায় কে নেবে?

আরেকটি বিষয় প্রশ্ন তোলে। এমপিওভুক্ত অনেক স্কুল-কলেজের নিজস্ব সম্পদ কম নয়। অভিযোগ আছে, ম্যানেজিং কমিটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকা কিছু সদস্য সেই সম্পদ নিজেদের মতো ভোগ করেন, এমনকি লুটপাটও করেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে সরকারের বাড়তি ব্যয় খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। বিনিময়ে মিলত স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, নিশ্চিত বেতন-কাঠামো আর কমিটির খবরদারি থেকে মুক্তি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথও খুলত। কারণ মেধাবী শিক্ষকই মেধাবী প্রজন্ম গড়েন।

একই পদে শুরু, একই পদে অবসর:

চাকরির অন্য ক্ষেত্রে পদোন্নতি স্বাভাবিক নিয়ম। শিক্ষকতায় তা প্রায় ব্যতিক্রম। অনেক শিক্ষককে যে পদে যোগ দেন, সেই পদেই অবসরে যেতে হয়। যেখানে পদোন্নতির ব্যবস্থা আছে, সেখানেও জটিলতা তৈরি করে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করা হয়। আরও বিস্ময়কর হলো, অভিযোগ রয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে নীতিমালা বদলে কেরানি বা হিসাবরক্ষক থেকে শিক্ষা কর্মকর্তা হওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে।

এই বঞ্চনার চিত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানে আরও স্পষ্ট। ৭ সেপ্টেম্বর বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৬৬ শতাংশ শূন্য। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ ফাঁকা ৭৫ শতাংশ। সহজ ভাষায়, এসব বিদ্যালয়ের প্রতি তিনটির দুটিতে নেই প্রধান শিক্ষক, আর সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই প্রায় প্রতি চারটির তিনটিতে। নেতৃত্বহীন প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলে, তা সহজেই অনুমেয়। অথচ এই শূন্য পদগুলো পূরণের স্বাভাবিক পথ হলো অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পদোন্নতি।

তদারকি কাঠামোর চিত্রও একই রকম উদ্বেগজনক। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিক বিদ্যালয় মনিটরিংয়ের জন্য বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদ এবং সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সবগুলোই শূন্য, অর্থাৎ ১০০ শতাংশ। সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদও পুরোপুরি ফাঁকা। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদের ২৩টি (৩৬ শতাংশ) শূন্য। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৪৯৬টি পদের ৩১৫টি (৬৪ শতাংশ) এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৪৯৬টি পদের ৩০৭টি (৬২ শতাংশ) খালি। যে ব্যবস্থার মনিটরিংয়ের মেরুদণ্ডই এতটা ফাঁকা, সেখানে মান নিশ্চিতের দাবি অর্থহীন।

এই শূন্যতার পাশে আরেকটি অসংগতি চোখে পড়ে। নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও মাধ্যমিকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে না, যদিও ওই পদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই খালি। একদিকে পদ ফাঁকা, অন্যদিকে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক পদোন্নতির অপেক্ষায়। এই দুইয়ের মধ্যে সেতু বাঁধতে সরকারের ইচ্ছাটাই যেন অনুপস্থিত।

আবার যাঁরা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের অনেকের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। যিনি নিজে কখনো ক্লাস নেননি, তিনি ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে কী পরামর্শ দেবেন? অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এসব শূন্য পদে বসালে মনিটরিং হতো বাস্তবসম্মত, প্রধান শিক্ষকের শূন্যতাও কমত, আর শিক্ষক পেতেন কর্মজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু মনে হয়, শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ও মেধার মূল্যায়ন করার সদিচ্ছা নীতিনির্ধারকদের নেই।

যাঁরা এগিয়ে, তাঁরা শুরু করেছেন শিক্ষককে দিয়ে:

যেসব দেশ শিক্ষায় এগিয়ে, তারা শুরু করেছে শিক্ষককে দিয়েই। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা প্রতিযোগিতামূলক ও সম্মানিত পেশা, যেখানে উচ্চ যোগ্যতা প্রয়োজন এবং শিক্ষকের পেশাগত স্বাধীনতা আছে। সিঙ্গাপুর মেধাবী স্নাতকদের টানতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন, নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ ও স্পষ্ট ক্যারিয়ার পথ রেখেছে। দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষককে জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি বদলায়নি, কিন্তু সূচনা বিন্দু ছিল একটাই: শিক্ষক হবেন জাতির সেরা মানুষদের একজন।

করণীয়:

আমাদের করণীয়ও তাই সুস্পষ্ট-

বেতন ও মর্যাদা: শিক্ষকের যোগ্যতা ও দায়িত্বের সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন কাঠামো নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডের সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে আনতে হবে। উচ্চতর গ্রেড হতে হবে অর্থবহ এবং তা পাওয়ার প্রক্রিয়া হতে হবে সহজ ও সময়মতো। বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এমন হতে হবে, যাতে মেধাবী স্নাতক শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয় এবং সংসার চালাতে শিক্ষককে অন্য পেশার দিকে তাকাতে না হয়।

স্বচ্ছ নিয়োগ: নিয়োগ হবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। এনটিআরসিএর কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে নিয়োগের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কমাতে হবে।

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণ: সম্পদশালী ও যোগ্য এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে বেসরকারি শিক্ষকেরাও একই নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাবেন, আর প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কমিটির ব্যক্তিগত স্বার্থের বদলে শিক্ষার কাজে লাগবে।

শূন্য পদ পূরণ ও পদোন্নতি: প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং পরিদর্শক ও শিক্ষা কর্মকর্তার শূন্য পদগুলো সময়বদ্ধ পরিকল্পনায় পূরণ করতে হবে। এসব পদে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পদোন্নতি ও পদায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং নীতিমালা মেনে স্পষ্ট ও নিয়মিত পদোন্নতির কাঠামো থাকতে হবে।

বরাদ্দের স্বচ্ছতা: প্রকল্প, নির্মাণ ও প্রশিক্ষণের ব্যয় প্রকাশ্য নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন যাচাই ছাড়া ভবন বা প্রকল্প অনুমোদন বন্ধ করতে হবে।

লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা: টিফিন, উপবৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে দিতে হবে। সাশ্রয়ের অর্থ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, বেতন কাঠামো ও শ্রেণিকক্ষের আধুনিকায়নে লাগাতে হবে।

কার্যকর প্রশিক্ষণ: প্রশিক্ষণ হতে হবে মানসম্মত ও ফলাফলনির্ভর, ভ্রমণ ও আনুষ্ঠানিকতানির্ভর নয়। ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও গ্রন্থাগার এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন; তবে প্রযুক্তি কাজে আসে তখনই, যখন তা ব্যবহারের মতো প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক থাকেন।

প্রশাসনিক বোঝা কমানো: অশিক্ষকসুলভ কাজের চাপ কমিয়ে শিক্ষককে পাঠদান ও পাঠ-প্রস্তুতিতে মনোযোগী রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকের প্রতি অসম্মান ও সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও নীতি দরকার।

আবার শিক্ষকদেরও কোচিং-বাণিজ্য থেকে দূরে থেকে পেশাগত নৈতিকতা ও শিক্ষার্থীর প্রতি দায়বদ্ধতা রক্ষা করতে হবে। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসা তাঁর পেশাগত অঙ্গীকার। মর্যাদা দাবির নৈতিক জোর আসে আচরণ থেকেও।

উপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, কোনো জাতি তার শিক্ষকদের মানের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। এই চিরন্তন সত্য আমরা জানি, কিন্তু মানি না। শিক্ষককে অবহেলা করে, অথচ শিক্ষার নামে বরাদ্দ ঢেলে শিক্ষার উন্নয়ন চাওয়া মানে শেকড় কেটে গাছে ফল আশা করা। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক ও সমাজের কাছে আমার একটিই আবেদন: শিক্ষককে শুধু দিবসে নয়, প্রতিদিন মর্যাদা দিন। তাঁকে নিশ্চিন্ত জীবন, আত্মবিশ্বাস ও আধুনিক হওয়ার সুযোগ দিন। তিনি আপনাকে ফিরিয়ে দেবেন এমন একটি প্রজন্ম, যারা শুধু সনদধারী নয়, প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত, মানবিক ও দক্ষ নাগরিক। শিক্ষক যেদিন সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন, সেদিনই জাতি সত্যিকারের উন্নতির পথে হাঁটতে শুরু করবে।

লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল