ঢাবিতে দলীয় নিয়োগ বন্ধসহ ৯ দাবি জাতীয় ছাত্রমঞ্চের
সংগৃহীত
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় নিয়োগ বন্ধ, উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি নিশ্চিত এবং হলের আসন মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে বরাদ্দসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রমঞ্চ। সংগঠনটির দাবি, প্রশাসনের দলীয়করণ অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হল নিয়ন্ত্রণ, গণরুম, গেস্টরুম, র্যাগিং ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসতে পারে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানায় সংগঠনটি। এতে জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ ও প্রধান সমন্বয়কারী শাহ্ জামাল সায়েম বক্তব্য দেন।
সংগঠনটির ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ, হলের আসন মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে বরাদ্দ, সিট বরাদ্দে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা, র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, স্বাধীন অ্যান্টি-র্যাগিং ও স্টুডেন্ট সেফটি সেল গঠন, দখলদারিত্বের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগের স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা।
জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ বলেন, “ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে। প্রশাসনিক নিয়োগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, একাডেমিক নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ডের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জনের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটির সুপারিশ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সালমান শরীফ।
এ ছাড়া ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের আওতাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনেটের নির্বাচিত প্যানেলের বিধান পাশ কাটিয়ে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র বিধান ব্যবহার করে উপাচার্য নিয়োগের অভিযোগও তোলেন তিনি।
সালমান শরীফ বলেন, “কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা অপরাধ নয়। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক আনুগত্য যদি যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যালয় নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, মুক্তবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিষ্ঠান।”
তিনি আরো বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নিয়োগের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার বিরোধিতা করেছে ছাত্র ও শিক্ষকসমাজ। একই প্রক্রিয়া নতুন সরকারের সময়েও পুনরাবৃত্তি হলে সেটি সংস্কার নয়, বরং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন রূপ।”
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে উপাচার্য নিয়োগের প্রতিবাদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কথা তুলে ধরেন সালমান শরীফ।
“প্রশাসনের দলীয়করণের ফলে হলের আসন বরাদ্দ, প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ও সংগঠনের কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর মাধ্যমে গণরুম, গেস্টরুম, র্যাগিং, হল নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সাংগঠনিক চাপের মতো পুরোনো দমনমূলক সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে”, যোগ করেন তিনি।
জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সমন্বয়কারী শাহ্ জামাল সায়েম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো রাজনৈতিক দলের দখলকেন্দ্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, দখলদারিত্বের পরিবর্তে গণতন্ত্র, সিট বাণিজ্যের পরিবর্তে ন্যায্যতা, র্যাগিংয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা এবং ভয়ের পরিবর্তে মুক্ত মতপ্রকাশের ক্যাম্পাস চাই।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে জাতীয় ছাত্রমঞ্চ সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে কার্যকর সংস্কারের আহ্বান জানায়।