ক্ষমতা টেকাতে ‘পাশবিক অত্যাচার’, মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন মামলা

ক্ষমতা টেকাতে ‘পাশবিক অত্যাচার’, মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন মামলা

সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে বন্দি ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের আইনি জটিলতা আরো মারাত্মক রূপ নিয়েছে। ভেনিজুয়েলায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় মার্কিন নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে এই দম্পতির বিরুদ্ধে নতুন একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশ করা আদালতের নতুন এই অভিযোগপত্রে (সুপারসিডমেড ইনডিক্টমেন্ট) মাদুরো ও ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও বন্দিদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের গুরুতর বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অবৈধ অস্ত্র রাখার যে মামলাগুলো ছিল, নতুন এই অভিযোগগুলো তার সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হলো। তবে শুরু থেকেই সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এই দম্পতি। 

৬৩ বছর বয়সী মাদুরো এবং ৬৯ বছর বয়সী ফ্লোরেস চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনের একটি আটক কেন্দ্রে (ডিটেনশন সেন্টার) বন্দি রয়েছেন।

এর আগে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে তাদের কম্পাউন্ডে মার্কিন বাহিনী এক অতর্কিত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ফ্লোরেসের গৃহবন্দি (হাউস অ্যারেস্ট) থাকার আবেদন নাকচ করে দিলে বিচার শুরুর আগ পর্যন্ত দুজনকেই ব্রুকলিন সেন্টারে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হতে যাচ্ছে।

মাদুরোর আইনজীবী ব্যারি জে পোল্যাক জানিয়েছেন, তার মক্কেল নতুন এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন এবং আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে উন্মুখ হয়ে আছেন।

অন্যদিকে, ভেনিজুয়েলার সাবেক ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে মাদক-সন্ত্রাসবাদের আগের মামলাটিতেও নতুন করে আসামি করেছে মার্কিন প্রসিকিউশন। 

প্রকাশিত নতুন অভিযোগপত্রে মার্কিন কৌঁসুলিরা দাবি করেন, মাদুরো দম্পতি ভেনিজুয়েলায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে চরম সহিংসতা, বেআইনি গ্রেফতার এবং মার্কিন নাগরিকসহ অন্যান্য বন্দিদের নির্যাতনের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে—ইলেকট্রিক শক দেওয়া, শ্বাসরোধ করা, ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে রাখা, দীর্ঘমেয়াদে নিঃসঙ্গ কারাবাস, অনাহারে রাখা, শাস্তিমূলক কক্ষে বন্দি রাখা এবং ভয়াবহ মানসিক অত্যাচার। কৌঁসুলিদের অভিযোগ, এই মানসিক নির্যাতনের অংশ হিসেবে বন্দিদের শিশু সন্তান ও স্বজনদের মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হতো।

বৃহস্পতিবার আদালত চত্বরের বাইরে কৌঁসুলিরা সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাদুরো ও ফ্লোরেস যেন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই সবকিছু করা হয়েছিল।

আমরা অভিযোগ করছি, এই চরম পাশবিক আচরণ মার্কিন নাগরিকদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, যা চরম দুর্নীতির একটি উদাহরণ।’

কৌঁসুলিরা আরো জানান, ভেনিজুয়েলার সেই দমনপীড়নমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৎকালীন ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি সরাসরি নির্দিষ্ট কিছু বন্দিকে নির্যাতনের আদেশ দিতেন এবং নির্যাতনের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত আপডেট নিতেন। অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নিজের পরিবারের সদস্যদের আইনি হাত থেকে আড়াল ও সুরক্ষা দিতেই তিনি এমন জঘন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন আদালতের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগপত্রটি সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের রোমহর্ষক বিবরণের সঙ্গে মিলে যায়। ভেনিজুয়েলার একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান হাভিয়ার তারাজোনা জানান, বেআইনিভাবে গ্রেফতার করার পর তাকে ও তার ভাইকে একটানা ৪৬ দিন একটি অন্ধকার ছোট কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল। আরেক সাবেক বন্দি অ্যাঞ্জেল গডোয় জানান, তাকে মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল এবং তার স্ত্রীকেও জানতে দেওয়া হয়নি তিনি কোথায় আছেন।

মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে শপথ নেন। পরবর্তীতে একটি সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় শত শত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হলেও, বন্দি অধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘ফোরো পেনাল’-এর তথ্য অনুযায়ী এখনো ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

এদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন, মাদুরোকে গ্রেফতার করার পরও বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পেয়েছে তার দফতর। গত মার্চ মাসে টুর্ক মন্তব্য করেছিলেন, মাদুরো অপসারিত হলেও ভেনিজুয়েলায় ‘কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার উদ্বেগ’ এখনো আগেই মতোই আছে।