বিড়াল পালন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

বিড়াল পালন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ফাইল ছবি

মানুষের চারপাশে ছড়িয়ে আছে আল্লাহ তাআলার অসংখ্য সৃষ্টির নিদর্শন। আকাশের পাখি, নদীর মাছ, বনের হরিণ কিংবা মানুষের ঘরের ছোট্ট বিড়াল—প্রতিটি প্রাণীই মহান স্রষ্টার কুদরতের এক অনন্য নিদর্শন।

এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, জীবনধারা ও প্রয়োজন। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারী এমনই একটি পরিচিত প্রাণী বিড়াল। তার কোমল স্বভাব, চঞ্চলতা, পরিচ্ছন্নতা এবং মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তুলেছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাণী ও জীবজন্তুর সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষকে চিন্তা করতে বলেছেন।

এসব সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৪৫)

বিড়ালও আল্লাহর সৃষ্টি। তার শারীরিক গঠন, শিকার করার দক্ষতা, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সৃষ্টিজগতের বৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে।

এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে চিন্তা করলে একজন মুমিনের অন্তরে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত হতে পারে। তবে কোরআনের এই আয়াতে বিশেষভাবে বিড়ালের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং সব জীবন্ত প্রাণীর সৃষ্টির সাধারণ নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। সাহাবি আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিড়াল সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই বিড়াল অপবিত্র নয়। তারা তো তোমাদের আশপাশে বিচরণকারী প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৭৫)

বিড়াল মানুষের ঘরে, উঠানে কিংবা বসবাসের স্থানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে।

তাই তার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংস্পর্শ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ কারণেই বিড়ালের স্বাভাবিক শরীর বা লালাকে অপবিত্র মনে করার প্রয়োজন নেই। কোনো বিড়াল পানির পাত্রে মুখ দিলে, সেই পানি অন্য কোনো কারণে অপবিত্র না হলে, শুধু বিড়ালের মুখ দেওয়ার কারণে তা নাপাক হয়ে যায় না।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—বিড়াল পবিত্র হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার শরীরে লেগে থাকা সব ধরনের ময়লা বা ক্ষতিকর পদার্থও পবিত্র। যেমন, তার শরীরে মানুষের মলমূত্র বা অন্য কোনো নাপাক বস্তু লেগে থাকলে সেই বস্তু অপবিত্র হিসেবেই গণ্য হবে। একইভাবে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি।

বিড়াল পালনের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামে বিড়াল পালনের অনুমতি রয়েছে। বিড়াল পোষা নিজে কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয়। তবে তাকে পোষার সঙ্গে কিছু দায়িত্বও জড়িত। বিড়ালকে ঘরে রাখলে তার খাবার, পানীয়, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে পোষার অর্থ শুধু নিজের আনন্দের জন্য একটি প্রাণীকে ঘরে রাখা নয়; বরং তার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা।

কোনো ব্যক্তি যদি বিড়াল পোষেন, অথচ তাকে নিয়মিত খাবার না দেন, অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা না করেন কিংবা তাকে এমনভাবে আটকে রাখেন, যাতে সে কষ্ট পায়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি সতর্কতামূলক হাদিস রয়েছে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক নারী একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি ভোগ করেছে। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল, অবশেষে সেটি মারা যায়। এর ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। সে বিড়ালটিকে আটকে রাখার সময় খাবার ও পানীয় দেয়নি, আবার তাকে ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩১৮)

প্রাণীর প্রতি দয়া আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম

ইসলামে দয়া ও সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রাণীর প্রতিও সদয় হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)

একটি ক্ষুধার্ত বিড়ালকে খাবার দেওয়া, তৃষ্ণার্ত বিড়ালকে পানি পান করানো, আহত বিড়ালকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া কিংবা অসহায় বিড়ালছানাকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দেওয়া—এসবই দয়া ও সহমর্মিতার বাস্তব প্রকাশ।

বিড়াল নিয়ে কুসংস্কারে বিশ্বাস কাম্য নয়

সমাজে বিড়াল নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কোথাও বিড়াল রাস্তা অতিক্রম করলে অমঙ্গল হবে বলে মনে করা হয়, কোথাও কালো বিড়ালকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য শরয়ি প্রমাণ নেই। ইসলাম মানুষকে অমূলক কুসংস্কার পরিহার করে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়। কোনো বিড়াল সামনে দিয়ে চলে গেলে কিংবা ঘরের আশপাশে ডাকলে ভবিষ্যতে অমঙ্গল ঘটবে—এমন বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে বিড়াল ঘরে প্রবেশ করলেই রিজিক বেড়ে যায় কিংবা বিড়ালকে বিশেষ কোনো খাবার খাওয়ালে নিশ্চিতভাবে বিপদ দূর হয়ে যায়—এ ধরনের বিশ্বাসও নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।