অফুরন্ত রিজিক লাভে নিয়মিত যে ১৫ দোয়া পড়বেন

অফুরন্ত রিজিক লাভে নিয়মিত যে ১৫ দোয়া পড়বেন

ফাইল ছবি

মানুষের জীবনে রিজিকের প্রয়োজন অপরিসীম। জীবিকা নির্বাহ, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সন্তানদের লালন-পালন এবং মানুষের কল্যাণে অবদান রাখার জন্য অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন হয়।

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিকের প্রকৃত সার্থকতা শুধু তার প্রাচুর্যে নয়; বরং তা হালাল হওয়া, তাতে বরকত থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হওয়ার মধ্যেই নিহিত। অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেউ অশান্তিতে ভুগতে পারে, আবার অল্প সম্পদেও কারও জীবন হতে পারে প্রশান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ। 

তাই একজন মুমিনের কামনা হওয়া উচিত—আল্লাহ যেন তাঁকে পবিত্র ও হালাল রিজিক দান করেন, হারাম উপার্জন থেকে হেফাজত করেন এবং তাঁর অনুগ্রহে অন্যের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত রাখেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো।

’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

অন্যদিকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হালাল উপার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ মানুষের উপার্জন, খাদ্য ও জীবনযাপনের সঙ্গে তার ইবাদত, নৈতিকতা এবং আখিরাতের সফলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

এখানে হালাল রিজিক লাভ, ঋণ ও অভাব থেকে মুক্তি, উপার্জনে বরকত, কাজ সহজ হওয়া এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের জন্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া আরবিতে বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ তুলে ধরা হলো।

১. হালাল রিজিক লাভ ও হারাম থেকে বাঁচার দোয়া

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত করুন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৬৩)

২. ঋণের বোঝা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দালা‘ইদ-দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার এবং মানুষের প্রভাব ও আধিপত্য থেকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৬৯)

৩. দারিদ্র্য, অভাব ও অপমান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ، وَالْقِلَّةِ، وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়ায-যিল্লাতি, ওয়া আউযু বিকা মিন আন আযলিমা আও উযলাম।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অপমান থেকে।

আর আপনার কাছে আশ্রয় চাই, যেন আমি কারও প্রতি জুলুম না করি এবং আমার প্রতিও জুলুম করা না হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৪)

৪. উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুল আমলের দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান নাফিআন, ওয়া রিযকান তইয়িবান, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালান।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র ও উত্তম রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৯২৫)

আমলের সময় : নবীজি (সা.) ফজরের নামাজের পর এই দোয়া পড়তেন। তাই ফজরের নামাজের পর দিনের শুরুতে এটি পড়া সুন্নাহ।

৫. দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও কল্যাণ লাভের দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল-আফিয়াতা ফিদ-দুনইয়া ওয়াল-আখিরাহ।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, সুস্থতা ও কল্যাণ প্রার্থনা করছি। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৭৪)

৬. ক্ষমা ও তওবা কবুলের দোয়া

رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.

উচ্চারণ : রব্বিগফির লী ওয়া তুব আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত-তাওয়াবুর-রহীম।

অর্থ : হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি বারবার তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫১৬)

৭. সংক্ষিপ্ত ইস্তিগফার

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ.

উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহা ওয়া আতূবু ইলাইহি।

অর্থ : আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩০৭)

আমল : নিয়মিত ইস্তিগফার করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে ইস্তিগফারের সঙ্গে গুনাহ পরিহার, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং হালাল পথে চলার আন্তরিক চেষ্টা থাকা জরুরি।

৮. দুনিয়া ও আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

উচ্চারণ : রব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আযাবান-নার।

অর্থ : হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১)

৯. আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও রিজিক লাভের দোয়া

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ.

উচ্চারণ : রব্বি ইন্নী লিমা আনযালতা ইলাইয়্যা মিন খাইরিন ফাকীর।

অর্থ : হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী। (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৪)

প্রেক্ষাপট : হজরত মুসা (আ.) মিসর থেকে মাদইয়ানে পৌঁছে কঠিন পরিস্থিতিতে এই দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর জন্য আশ্রয় ও জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন।

১০. কাজ সহজ হওয়া ও মানসিক প্রশান্তির দোয়া

رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي ۝ وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي.

উচ্চারণ : রব্বিশরাহ লী সদরী, ওয়া ইয়াসসির লী আমরী।

অর্থ : হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ২৫–২৬)

আমলের সময় : চাকরির সাক্ষাৎকার, ব্যবসায়িক আলোচনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের আগে এই দোয়া পড়া যায়। এটি হজরত মুসা (আ.)-এর দোয়া।

১১. বরকতময় অবস্থান লাভের দোয়া

رَبِّ أَنْزِلْنِي مُنْزَلًا مُبَارَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ.

উচ্চারণ : রব্বি আনযিলনী মুনযালাম মুবারাকাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল-মুনযিলীন।

অর্থ : হে আমার রব! আমাকে বরকতময় স্থানে অবতরণ করান। আপনিই সর্বোত্তমভাবে অবতরণ করান। (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ২৯)

১২. রহমত ও সঠিক পথ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا.

উচ্চারণ : রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাওঁ ওয়া হাইয়ি লানা মিন আমরিনা রাশাদা।

অর্থ : হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করে দিন। (সুরা : কাহফ, আয়াত : ১০)

১৩. আল্লাহর ওপর ভরসা করার দোয়া

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ.

উচ্চারণ : হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল-ওয়াকীল।

অর্থ : আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৩)

১৪. ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া

بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ.

উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থ : আল্লাহর নামে বের হলাম, আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৯৫)

আমলের সময় : কাজ, অফিস, দোকান কিংবা বাজারে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়া সুন্নাহ। এটি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার শিক্ষা দেয়।

১৫. বাজারে প্রবেশের সময় আল্লাহর জিকির

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল-মুলকু ওয়া লাহুল-হামদু, ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু, ওয়া হুয়া হাইয়্যুল্লা ইয়ামূতু, বিয়াদিহিল-খাইরু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

অর্থ : আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। সমস্ত কল্যাণ তাঁরই হাতে এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪২৮)

মনে রাখতে হবে, দোয়া মুমিনের শক্তি, হালাল উপার্জন তার দায়িত্ব, আর আল্লাহর ওপর ভরসা তার অবলম্বন। দোয়া করার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে। আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের হালাল ও পবিত্র রিজিক দান করেন, উপার্জনে বরকত দেন, ঋণ ও অভাব থেকে মুক্তি দেন, হারাম থেকে হেফাজত করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করেন। আমিন।