যুযুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের ছায়া নৌ-বহর নেটওয়ার্ক

যুযুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের ছায়া নৌ-বহর নেটওয়ার্ক

সংগৃহীত ছবি

ইরানকে চাপে রাখতে এবার দেশটির ‘শ্যাডো ফ্লিট’ (ছায়া নৌ-বহর) নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান ও জাহাজ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং পণ্য পরিবহনে সহায়তা করছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১৩৯০২’-এর আওতায় এই নিষেধাজ্ঞাগুলো দেওয়া হয়েছে। এই আদেশের লক্ষ্য হলো, ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যালকে লক্ষ্যবস্তু করা করা হয়েছে। এতে ইরানি শাসনব্যবস্থা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন অর্থায়ন করতে না পারে।

বুধবারের এই নিষেধাজ্ঞাগুলো এমন সময়ে এল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন গত ২৪শে আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল। ইরানকে ওয়াশিংটনের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য করতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে তাদের বিরুদ্ধে কয়েক দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

অর্থবিভাগ পানামা ও গ্রিসভিত্তিক ল ফার্ম ‘কারনাকিস অ্যান্ড কারনাকিস’ এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ শিপিং নেটওয়ার্ককে আইনি সহায়তা প্রদান করছিল। অর্থবিভাগ জানিয়েছে, এই ল ফার্মটি পরোক্ষভাবে ইরানকে তাদের পারমাণবিক, সামরিক ও অস্ত্র কর্মসূচির জন্য তহবিল সংগ্রহের সুযোগ করে দিয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ‘কারনাকিস অ্যান্ড কারনাকিস’ এমন সব শিপিং কোম্পানি নিবন্ধনে সহায়তা করেছে, যেগুলোর মালিকানাধীন জাহাজগুলো ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসব জাহাজের মাধ্যমে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইরানি পেট্রোলিয়াম, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, এই ল ফার্মটি এমন কিছু কোম্পানি গঠন করেছিল, যা মূলত ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-কুদস ফোর্স’ এবং হুতিদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইরানি তেল বিক্রির নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করত।

নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এই ফার্মের সাথে যুক্ত এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত শিপিং এজেন্টরাও রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই এজেন্টরা সরাসরি ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ‘ছায়া নৌবহর’ পরিচালনায় সহায়তা করছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা হলেন, সোফিয়ানোস কারনাকিস কসমাস, কনস্টানটিনোস কারনাকিস কসমাস, পেদ্রো ওর্তেগা জোন্স, রবার্তো ওর্তেগা জোন্স এবং ইওয়ানিস কারনাকিস কসমাস।

এছাড়া অর্থ বিভাগ ‘রক্সেট মেরিটাইম শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং এস.এ.’ নামক একটি জাহাজ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি এবং পানামার পতাকাবাহী সাতটি কার্গো জাহাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অর্থবিভাগ জানিয়েছে, গত এক বছরে এই জাহাজগুলোর মধ্যে তিনটি ব্যবহার করে ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যসহ বিভিন্ন ইরানি পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কার্গো জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অ্যানেমোস’,‘ডেস্টিনি’, ‘ফ্লেমিঙ্গো ১’,‘গ্লোরিস’, ‘হারমনি’, ‘প্রাইড’ এবং ‘প্রিন্স’। মার্কিন অর্থবিভাগ সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক শিপিং এজেন্সি ‘অ্যামিগোজ সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং দুবাই-ভিত্তিক সামুদ্রিক ও লজিস্টিক কোম্পানি ‘হোয়েলস শিপিং লাইন এলএলসি’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, আপনারা সমুদ্রে অবৈধভাবে তেল স্থানান্তর করুন কিংবা কোনো ল ফার্মের বিলাসবহুল অফিসে বসে থাকুন। যদি আপনারা ইরানি শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করেন, তবে আমরা আপনাদের খুঁজে বের করব এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করব। তিনি আরও বলেন, তেহরানকে সহায়তাকারীদের একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনারা আমাদের পক্ষে আছেন, নয়তো বিপক্ষে। আপনারা কারা, কী করছেন তা আমাদের জানা আছে এবং আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখব।

বুধবার আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বা মার্কিন নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যেকোনো সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অর্থবিভাগের ‘অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’-কে অবহিত করতে হবে। এছাড়া অবরুদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অংশীদারিত্ব থাকা যেকোনো সত্তাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ১৭টি জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এই জাহাজগুলো দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহন করছিল।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অর্থ বিভাগের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে এল, যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতির পূর্বশর্ত হিসেবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানি শাসনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে আরোপিত এসব নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী অবরোধ কার্যকর করার লক্ষ্যে ১৩৮টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অন্য পথে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, গাল্ফ নিউজ।