ব্ল্যাকপুলের টাউন হলের ছোট্ট অনুষ্ঠান যেভাবে ফুটবলের অস্কার হয়ে উঠল

ব্ল্যাকপুলের টাউন হলের ছোট্ট অনুষ্ঠান যেভাবে ফুটবলের অস্কার হয়ে উঠল

ছবি: সংগৃহীত

স্ট্যানলি ম্যাথিউস ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। ব্ল্যাকপুলের টাউন হলে একটি ছোট অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এর সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে এ বছরের বিজয়ীকে দ্য লন্ডন প্যালেডিয়ামে এক তারকাখচিত ও রেড-কার্পেট ইভেন্টে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত অনলাইন বা টেলিভিশনে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উপভোগ করবেন।

অবশ্যই সময়ের পরিবর্তনে সবকিছু বদলায়। আর ৭০ বছর মানে আক্ষরিক অর্থেই একটি জীবনকাল। তবে ব্যালন ডি’অর কেবল জনপ্রিয়তার বিচারেই বিকশিত হয়নি, বরং এক বিস্ফোরণ ঘটেছে। শতাব্দীর শুরুতে ট্রফিটির তেমন কোনো গুরুত্বই ছিল না। ২০০১ সালের বিজয়ী মাইকেল ওয়েন তো জানতেনই না এটা কী। তিনি টকস্পোর্টকে-কে বলেছিলেন, ‘সেসব দিনে এটি আমাদের সংবাদমাধ্যমে কখনোই আসত না।’

তবে বর্তমানে ব্যালন ডি’অর একটি সর্বজনীন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি সমর্থক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় কে, তা নিয়ে সারা বছর ধরে চলা বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু এমনটি হওয়ার কারণ কী। কীভাবে একটি দলগত খেলায় ব্যক্তিগত সম্মাননা এত বেশি মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠল?

একঘেয়েমি থেকে জন্ম
বিখ্যাত ফরাসি ম্যাগাজিন ফ্রান্স ফুটবল ১৯৫০-এর দশকে পুরস্কারটি চালু করেছিল। এখনও ভোটদান প্রক্রিয়া তদারকি করে চলেছে।

জেরার্ড এজনেসের মতে, বার্ষিক ভিত্তিতে সেরা ইউরোপীয় ফুটবলারকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রাথমিক ধারণাটি এসেছিল ‘একঘেয়েমি’ থেকে, কারণ ফ্রান্স ফুটবল-এর লেখক এবং সম্পাদকরা ‘সবসময় নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে চাইতেন, এমনকি বেশি কপি বিক্রি করার জন্যও।’

১৯৯৫ সালে এটি ইউরোপে খেলা সব জাতীয়তার খেলোয়াড়দের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং ২০০৭ সালে এটি একটি বৈশ্বিক পুরস্কারে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে নারীদের পুরস্কারও যুক্ত করা হয়। ফলস্বরূপ, গারিঞ্চা, পেলে এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো প্রখ্যাত নামগুলো বিজয়ীদের তালিকায় থাকতে পারেনি।

সেদিক থেকে বলতে গেলে ফ্রান্স ফুটবল এমন একটি পুরস্কারের চারপাশে একটি রহস্যময় আভা ও জৌলুস তৈরি করার কৃতিত্বের দাবিদার, যা তার অস্তিত্বের দীর্ঘ সময় ধরে ছিলই না। তবে এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ব্যালন ডি’অর ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কারে পরিণত হওয়ার প্রধান কারণ এর আয়োজকদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।

বরং আয়োজকরা সৌভাগ্যবান ছিলেন যে খেলার ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই খেলোয়াড় কেবল একই সময়ে আবির্ভূত হননি, বরং এটি এমন এক যুগে ঘটেছিল যখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গণমাধ্যমের কভারেজ ছিল।

লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রভাব
আর্জেন্টিনা ও পর্তুগালের এই দুই তারকা মাঠ এবং ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে এক রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করেছিলেন। এই দুজনই মূলত ব্যালন ডি’অরকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। তারা ছিলেন এবং এখনও গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই খেলোয়াড়। পাঁচ বছর আগে পর্তুগিজ তারকার খেলায় নাটকীয় অবনতি ঘটার আগ পর্যন্ত কে সেরা, তা নিয়ে হাস্যকর কিন্তু উত্তপ্ত বিতর্ক এড়ানো অসম্ভব ছিল।

ফলস্বরূপ ব্যালন ডি’অর তাদের নিজ নিজ সমর্থকদের মধ্যে একটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, কারণ পুরস্কারটিকে এক ধরনের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য বিচারক হিসেবে দেখা হতো। স্পষ্টতই, বাস্তবটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।

বছরের পর বছর ধরে বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার কিছু জড়িয়ে ছিল রোনালদো এবং মেসির সঙ্গে, যারা এক দশক ধরে (২০০৭-২০১৭) নিজেদের মধ্যে ব্যালন ডি’অর ভাগ করে নিয়েছিলেন। তবে কে জিতল তা ফ্রান্স ফুটবল-এর জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত রোনালদো এবং মেসি উভয়েই লড়াইয়ে ছিলেন, ততক্ষণ তাদের হারানোর কিছু ছিল না। যেমনটি সাবেক পরিচালক প্যাসকেল ফেরের একবার স্বীকার করেছিলেন, ‘তারা ১০ বছর ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছিল এবং ফ্রান্স ফুটবল লাভবান হয়েছিল।’

আসলে একটি পুরো প্রজন্ম দুই জীবন্ত কিংবদন্তিকে এমন একটি মূল্যবান উপাধির জন্য লড়াই করতে দেখে বড় হয়ে উঠেছে, যা অত্যন্ত লোভনীয় মনে হতো। আর আয়োজকরা এর পুরো সুযোগ নিয়েছিল।

বিশাল ব্যবসা
২০২৪ সালে রদ্রির জয়ে রিয়াল মাদ্রিদ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে তারা অনুষ্ঠানটি বর্জন করেছিল।

ফ্রান্স ফুটবল-এর প্রধান সম্পাদক তার রান্নাঘরে ভোট গণনা করতেন এবং তার স্ত্রী ফলাফল টাইপ করতেন। সেদিনগুলো অনেক পেছনে পড়ে গেছে। ব্যালন ডি’অর এখন একটি বিশাল ব্যবসা। এ বছরের অনুষ্ঠানটি থিয়েরি অঁরি এবং কেট স্কট পরিচালনা করবেন, যেখানে ২,০০০-এর বেশি অতিথি উপস্থিত থাকবেন এবং বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এটি কভার করবে।

পুরো অনুষ্ঠানটি মূলত ফুটবলের অস্কারে পরিণত হয়েছে, যে কারণে যে কেউ সেখানে উপস্থিত থাকতে চান। ক্লাবগুলো তাদের খেলোয়াড়দের এমনভাবে তুলে ধরে, যেমনটি সিনেমা স্টুডিওগুলো অস্কারের নমিনেশনের জন্য করে থাকে। ব্লিচার রিপোর্টের কাছে ফেরের যেমনটি বলেছেন, ‘যে অভিনেতা অস্কার জেতেন, তিনি আরও বেশি অর্থ উপার্জক হয়ে ওঠেন। আর যে খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জেতেন, তার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়।’

তবে খেলোয়াড়রা এখন ব্যালন ডি’অরকে তাদের প্রাথমিক ক্যারিয়ারের লক্ষ্যগুলোর একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করছেন, যা নিজেই বেশ বিস্ময়কর। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড স্বীকার করেছেন যে, তার কাছে লিভারপুলের হয়ে আরেকটি প্রিমিয়ার লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার চেয়ে কিংবা তার স্বদেশী ক্লাবের অধিনায়ক হওয়ার চেয়েও এই ট্রফি জয় করা বেশি মর্যাদাপূর্ণ। ফলস্বরূপ এই রাইটব্যাকের পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া খুব একটা আশ্চর্যজনক ছিল না, কারণ লস ব্লাঙ্কোসের চেয়ে ব্যালন ডি’অরকে আর কোনো ক্লাব এত বেশি গুরুত্ব দেয় না। এমনকি ২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে টপকে রদ্রি শীর্ষ পুরস্কার জিতেছে, এমন খবর পাওয়ার পর ক্লাবটি লজ্জাজনকভাবে অনুষ্ঠানটি বয়কট পর্যন্ত করেছিল।

খেলোয়াড় এবং দলগুলোর এমন আচরণ স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি, তবে এটি অপ্রত্যাশিতও নয়। আর্সেন ওয়েঙ্গার এক দশক আগেই এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন, যখন তিনি ব্যালন ডি’অরের বিরুদ্ধে থেকে বলেছিলেন, ‘খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত পুরস্কারের প্রতি অতিরিক্ত আচ্ছন্ন থাকার কারণে অনেক ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে।’

সাবেক আর্সেনাল কোচ আরও যোগ করেছিলেন, ‘আমার মনে হয় এটি কখনও কখনও স্বার্থপরতাকে উৎসাহিত করে।’ হোসে মরিনিও তার চিরশত্রুর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে ফুটবল ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর বেশি মনোযোগী হওয়ার কারণে দলীয় ধারণাকে কিছুটা হারিয়ে ফেলছে।’

দীর্ঘ মাসব্যাপী প্রচারণা
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর দাবিদারদের মধ্যে অন্যতম সোচ্চার প্রচারণাকারী ছিলেন এমবাপে।

পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। এমনকি এমবাপে ও লামিন ইয়ামালের মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়রাও মৌসুমের শুরু থেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের যুক্তি তুলে ধরে ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য প্রচারণায় নেমে পড়েছেন।

ফেরের মতে, এই ধরনের মরিয়া প্রচেষ্টাগুলোর সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফেরের মতে, ‘আমি সবসময়ই বলে এসেছি যে ব্যালন ডি’অর মিডিয়ার মঞ্চে জেতা যায় না, তবে সেখানে তা নিশ্চিতভাবেই হারিয়ে যেতে পারে।’ গাজেত্তা দেলো স্পোর্ট-কে ফরাসি এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এবারের পুরস্কারটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তবে অতিরিক্ত হট্টগোল এমন ভোটারদের বিরক্ত করতে পারে যারা সহজে বোকা হন না।’

জাঁকজমক ও গ্ল্যামার
বার্সেলোনার মতো ক্লাবগুলো পুরুষ ও নারী উভয় দলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের একই ছাদের নিচে নিয়ে আসার মাধ্যম হিসেবে এই অনুষ্ঠানটি ব্যবহার করে।

সোমবারে পুরুষ ও নারী বিভাগের অন্তত একটি পুরস্কারের জন্য মোট ৮৬ জন খেলোয়াড় এবং ১০ জন কোচ মনোনীত হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবণতা অনুযায়ী পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা থাক বা না থাক, তাদের বিশাল অংশই সোমবার লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। ক্লাবগুলো তাদের মনোনীত খেলোয়াড়দের বহন করার জন্য প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা করে থাকে, যা সফল পুরুষ ও নারী দল থাকা ক্লাবগুলোর জন্য রেড কার্পেটে একসঙ্গে তাদের প্রতিভা প্রদর্শনের একটি চমৎকার সুযোগ।

মেসি-রোনালদো যুগের ঘটনার তুলনায় এটি সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময়ে ওই দুজন এবং তৃতীয় একজন ফাইনালিস্ট একটি প্রাক-অনুষ্ঠান প্রেস কনফারেন্সের জন্য প্যারিস বা সুইজারল্যান্ডে (২০১০-১৫ সালের মধ্যে ফিফা যৌথভাবে পুরস্কারের আয়োজন করেছিল) ভ্রমণ করতেন এবং তার পরদিন ট্রফি প্রদান করা হতো। এটি তখনও ফুটবলের ক্যালেন্ডারের একটি বড় ইভেন্ট ছিল, তবে সমসাময়িক খেলোয়াড়দের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত।

২০১৮ সালে মহিলাদের ব্যালন ডি’অরের প্রবর্তন এবং পুরুষদের বিভিন্ন ট্রফির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরও পুরস্কার যোগ করার প্রক্রিয়া এই চল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, এটি এখন খেলাধুলার জগতের সেরা পারফর্মারদের এক ছাদের নিচে জড়ো করার সবচেয়ে বড় রাত। অনুষ্ঠানটি নভেম্বর মাসের শেষের দিক থেকে এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত আরও বেশি সংখ্যক নারী খেলোয়াড়কে উপস্থিত হতে সাহায্য করেছে।

প্যারিস থেকে অনুষ্ঠানটি সরিয়ে নেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ফ্রান্স ফুটবল-এর মতে, স্ট্যানলি ম্যাথিউসের প্রথম জয়ের ৭০ বছর পূর্তি উদযাপনের জন্য একটি অস্থায়ী পদক্ষেপ। তবে এটি ভেবে অবাক হতে হয় যে, প্যারিসের পরিবর্তে লন্ডনে কোনো অ্যাওয়ার্ড শো আয়োজন করলে ফুটবলের বাইরের সেলিব্রেটিদের উপস্থিতি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি কি না। ফলে, হলিউডের সবচেয়ে বড় রাতের সাথে ক্রমবর্ধমানভাবে মিল থাকা এই ইভেন্টটি লন্ডনে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সুতরাং টাক্সেডো পরে নিন, সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি গায়ে জড়ান এবং ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হোন।