ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শিবিরের প্রকাশনা উৎসব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শিবিরের প্রকাশনা উৎসব

সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০২৭ সালের নববর্ষের প্রকাশনা উৎসব। এবারের আয়োজনের মূল ভাবনায় রয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি এবং মুসলিম সালতানাতের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের সামনে বটতলায় প্রকাশনা উৎসব ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়। স্টলজুড়ে ছিল নতুন বছরের প্রকাশনা এবং সংগঠনটির আগের বছরগুলোর প্রকাশনাও।

স্টলগুলোতে ছিল তিন পাতার ক্যালেন্ডার, এক পাতার বড় ও ছোট ক্যালেন্ডার, ডেস্ক ক্যালেন্ডার, ইয়ার প্ল্যানার, বাংলা ও ইংরেজি বড় ডায়েরি, মাঝারি ডায়েরি, পকেট ডায়েরি এবং ইসলাম ও সচেতনতামূলক বাণীসংবলিত স্টিকার।

ক্যালেন্ডারের পাতায় বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি

উৎসবে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল তিন পাতার ক্যালেন্ডারটি। এতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থকে ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম বিষয় ‘ভূ-রাজনীতি’। এতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, কৌশলগত সম্ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিষয় ‘সীমান্ত’। তৃতীয় বিষয় ‘নদী’। এতে পানির হিস্যা, অলঙ্ঘনীয় জাতীয় স্বার্থ এবং পানির হিস্যার ঊর্ধ্বে নদীর জীবন- এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। চতুর্থ বিষয় ‘বঙ্গোপসাগর’। পঞ্চম বিষয় ‘পরিচয়’। এতে মুসলিম পরিচয়ের শেকড় সন্ধান, ১৯৭১ ও মুসলিম পরিচয়ের বিপর্যয়, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মোকাবিলা এবং আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় আত্মপরিচয়ের সন্ধানের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ বিষয় ‘প্রযুক্তি ও জ্বালানি’।

ডেস্ক ক্যালেন্ডারে স্থান পেয়েছে মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক ১২টি মসজিদের ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এছাড়াও, বাংলা ডায়েরিতে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের জায়গার পাশাপাশি রয়েছে সম্ভাব্য সরকারি ছুটির তালিকা, বাংলাদেশ সচিবালয় ও জেলা প্রশাসকদের ফোন নম্বর, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, দৈনন্দিন মাসনুন দোয়া, তারিখ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ নোট এবং বিশ্ব মানচিত্র।

ইংরেজি ডায়েরিতে আন্তর্জাতিক ডায়ালিং কোড, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর, নামাজ ও রোজার দিনপঞ্জি এবং মনীষীদের উক্তি যুক্ত করা হয়েছে। মাঝারি ও পকেট ডায়েরিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, উপহার ছক, ব্যক্তিগত তথ্যের ছক এবং ২০২৭ সালের ব্যবহারিক ডায়েরির ছক।

প্রকাশনা নিয়ে যা বললেন নেতারা

মোড়ক উন্মোচনের পর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এবং ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমসহ নেতারা স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। এ সময় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একে অপরকে নতুন বছরের প্রকাশনা উপহার দিতেও দেখা যায়। সিবগাতুল্লাহ উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে প্রকাশনাগুলোর বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।

কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রকাশনাগুলো দীর্ঘ গবেষণা ও চিন্তার ফসল। তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের নৈতিক ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি। ছাত্রশিবির সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিবছর গবেষণালব্ধ প্রকাশনা, সাময়িকী, বিজ্ঞান সাময়িকী ও ধর্মীয় বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এ বছর সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। নূরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রকাশনাগুলো কেবল উপহারসামগ্রী বা বিনোদনের উপকরণ নয়।” এসব প্রকাশনার মাধ্যমে ছাত্রসমাজ, পরিবার, অভিভাবক ও সুধীমহলের কাছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, ছাত্রশিবিরের পথচলাকে বারবার থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে সংগঠনটি কাউকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের আদর্শে আনতে চায়নি; বরং সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয় করার চেষ্টা করেছে। তাঁর দাবি, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশকে আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতজানু করে রেখেছিল। সেই বাস্তবতা থেকেই এবারের ক্যালেন্ডারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একসময় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা বস্তুবাদী দর্শন নিয়ে অবাধে কথা বলার সুযোগ থাকলেও আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-কে নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। কোরআনের আসর আয়োজনের কারণে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও শোকজের মুখোমুখি হতে হতো। তাঁর ভাষ্য, আজ তাঁদের উত্তরসূরিরাই এই বটতলায় প্রকাশ্যে উৎসব আয়োজন করছেন।

তিনি দাবি করেন, ছাত্রশিবির চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারত্বের পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও জাতি গঠনের রাজনীতি করে। এর মাধ্যমে এমন একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে উঠছে, যারা ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, বিগত ১৬ বছরে ছাত্রশিবিরের গঠনমূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটি ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে সভ্যতা বিনির্মাণে কাজ করছে। এ পথে অবিচল থাকতে গিয়ে সংগঠনটির তিন শতাধিক সদস্য শহীদ হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মো. ফখরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, সমাজসেবা সম্পাদক ও রাকসুর ভিপি মো. মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, এইচআরডি সম্পাদক হেলাল উদ্দিন রুবেল, আইন সম্পাদক শামীম উদ্দীন, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান, ছাত্র অধিকার সম্পাদক ও জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ সেক্রেটারিয়েট ও কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং ঢাকার বিভিন্ন শাখার দায়িত্বশীলরা।