গুজব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ইসলাম
প্রতিকী ছবি
মানবসমাজের অবক্ষয় কেবল অন্যায়ের বিস্তারে ঘটে না; অন্যায়ের প্রতিকারের পরিবর্তে যখন অপপ্রচার, গুজব ও চরিত্রহননের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন সমাজ তার নৈতিক ভিত্তিও হারাতে থাকে। বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জ্ঞান ও নৈতিকতা চর্চার পবিত্র অঙ্গনে অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলে, প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচার।
কিন্তু বাস্তবতার পরিবর্তে অনুমান, যাচাইয়ের পরিবর্তে প্রচার এবং প্রতিকারের পরিবর্তে বিদ্বেষ প্রাধান্য পেলে অন্যায়ের অবসান ঘটে না; বরং তার ডালপালা আরও বিস্তৃত হয়। দুঃখজনক হলো, অনেকের প্রতিবাদের ভাষা ও তীব্রতা নির্ধারিত হয় ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডে নয়, বরং ব্যক্তি, দল ও মতাদর্শের পরিচয়ে। প্রতিপক্ষের সামান্য বিচ্যুতিতেও তারা সোচ্চার হন, অথচ নিজ পক্ষের গুরুতর অনিয়মের প্রশ্নে নেমে আসে রহস্যময় নীরবতা। তখন সত্যের প্রতি আনুগত্য নয়, পক্ষপাতই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের চালিকাশক্তি। ন্যায়বিচারের মুখোশে প্রতিহিংসা এবং নৈতিকতার স্লোগানে স্বার্থরক্ষার এই দ্বিচারিতা সমাজকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে। এভাবেই গুজবের আগুনে পুড়তে থাকে ব্যক্তির সম্মান, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও সামাজিক বিবেক।
সামান্য বাক্যে অসামান্য বিপর্যয়: গুজব নিছক কথার আদানপ্রদান নয়; এটি কখনো একটি পরিবারের শান্তি, কখনো একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন, আবার কখনো একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ধ্বংস করে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি অসমর্থিত অভিযোগ, প্রেক্ষাপটবিচ্ছিন্ন ভিডিও কিংবা সম্পাদিত ছবি মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ সত্যতা যাচাইয়ের আগ্রহের চেয়ে প্রচারের উত্তেজনাই যেন অধিক প্রবল।
কেউ গুজব রচনা করে, কেউ তাতে রং চড়ায়, কেউ যাচাই ছাড়াই ছড়িয়ে দেয়, আবার কেউ সেটিকে সত্য ধরে নিয়ে বিচারকের আসনে বসে যায়। এভাবে একজনের মিথ্যা বহু মানুষের সম্মিলিত অন্যায়ে পরিণত হয়। অথচ গুজবের রচয়িতা ও প্রচারকারী উভয়েই ইহকাল ও পরকালে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে, তোমরা তা যাচাই করে নাও; অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসবে, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে’ (সুরা আল-হুজুরাত-৬)। রসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়’ (সহিহ মুসলিম)।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনৈতিকতা : গুজব নয়, চাই বিচার : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদানের কেন্দ্র নয়; এটি চরিত্র নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার অন্যতম ভিত্তি। তাই সেখানে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্যাতন, আর্থিক অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ ওঠা আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও অন্যায়।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা