‘ওয়ারাফা’না লাকা জিকরাক’
ছবি: সংগৃহীত
আল্লাহ তাআলা তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে দিয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। আর সেই মানুষের মধ্যেও তিনি সর্বোচ্চ আসন দান করেছেন একজনকেই মুহাম্মদ (স.)। তিনিই সেই প্রিয় হাবিব, যাঁর মর্যাদা সব নবী-রাসুলের ঊর্ধ্বে, যাঁর সম্মান আসমান-জমিনের সীমানা ছাড়িয়ে আরশ পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘ওয়ারাফা’না লাকা জিকরাক (হে নবী! আমি আপনার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি)।’ (সুরা ইনশিরাহ: ৪)
এই ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুল (স.)-কে এমন এক মর্যাদা দিয়েছেন, যা মানবজাতির ইতিহাসে অতুলনীয়।
১. নবীদের নেতা: অনন্য এক মর্যাদা
একদিন প্রিয় নবী (স.) আল্লাহর দরবারে আরজি পেশ করলেন- ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সব নবীর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু আপনি ইবরাহিম (আ.)-কে করেছেন আপনার ‘খলিল’ (বন্ধু), মুসা (আ.)-কে দিয়েছেন আপনার সঙ্গে কথা বলার সম্মান, দাউদ (আ.)-কে এমন সুমধুর কণ্ঠ দিয়েছেন যাতে পাহাড়-পর্বতও তাঁর সঙ্গে তাসবিহ পাঠ করে, আর ঈসা (আ.)-কে দিয়েছেন মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা। তাহলে আমার বিশেষ মর্যাদা কোথায়?’
আল্লাহ তাআলা তখন ভালোবাসাপূর্ণ কণ্ঠে বললেন- ‘হে আমার প্রিয় হাবিব! আমি আপনাকে এমন মর্যাদা দিয়েছি, যা কাউকে দিইনি। আমার নাম যেখানে উচ্চারিত হয়, সেখানে আপনার নামও উচ্চারিত হয়। আরশ থেকে শুরু করে কোরআনের প্রতিটি পাতায় আমাদের নাম পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে।’
২. আল্লাহ যাঁর নামে শপথ নেন
মানুষ আল্লাহর নামে শপথ করে, কিন্তু আল্লাহ শপথ করেছেন তাঁর প্রিয় নবীর জীবনের নামে! ‘আপনার জীবনের শপথ! তারা তো বিভ্রান্তিতে ডুবে ছিল।’ (সুরা হিজর: ৭২)
শুধু তাই নয়, যে ভূমিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই পবিত্র নগরীরও শপথ করেছেন আল্লাহ- ‘আমি শপথ করছি এই নগরীর, আর আপনি এই নগরীর অধিবাসী।’ (সুরা বালাদ: ১-২)
৩. সব নবীর অঙ্গীকার: তাঁর অনুসরণ
মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী সকল নবীর কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- ‘যখন তোমাদের কাছে একজন রাসুল আসবে, তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।’ (সুরা আলে-ইমরান: ৮১)
অর্থাৎ, মুহাম্মদ (স.)-এর আগমন মানেই নবুয়তের পূর্ণতা। তিনি কেবল আমাদের নবী নন, বরং সব নবীরই নেতা ও ইমাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার কাছ থেকেও; নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও মারিয়মপুত্র ঈসার কাছ থেকেও। তাদের থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।’ (সুরা আহজাব: ৭)
উল্লিখিত আয়াত পাঁচজন নবীর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। আয়াতে বর্ণিত পাঁচজন নবীর মধ্যে মুহাম্মদ (স.)-এর মর্যাদা সবার চেয়ে বেশি। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মতভিন্নতা নেই যে পাঁচজন উলুল আজম নবীর মধ্যে মুহাম্মদ (স.)-ই শ্রেষ্ঠতর। তাঁর পর ইবরাহিম (আ.), তাঁর পর মুসা (আ.), তাঁর পর ঈসা (আ.) ও নুহ (আ.)।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৫/৮৮)
৪. নামের মর্যাদা: সম্মানসূচক সম্বোধন
কোরআনে অন্যান্য নবীকে নাম ধরে ডাকা হয়েছে- ‘হে আদম!’, ‘হে মুসা!’, ‘হে ঈসা!’। কিন্তু আমাদের নবীকে কোথাও ‘হে মুহাম্মদ’ বলা হয়নি। আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেছেন গভীর শ্রদ্ধায় ‘হে নবী!’, ‘হে রাসুল!’। তাঁর নামে নাজিল হয়েছে সুরা মুহাম্মদ, আর তাঁর পরিধেয় চাদরের সম্মানে নাজিল হয়েছে সুরা মুদ্দাসসির। এমন সম্মান আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।
৫. নবীর ইচ্ছায় বদলে গেল কিবলা
রাসুল (স.) মদিনায় এসে কাবার দিকে কিবলা ফেরার আশা করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রিয়জনের আকুতি প্রত্যক্ষ করে তা কবুল করলেন- ‘আমরা তোমার আকাশের দিকে তাকানো লক্ষ্য করেছি। এখন তোমাকে সেই কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি, যা তুমি পছন্দ করো।’ (সুরা বাকারা: ১৪৪)
৬. শত্রুর জবাব আল্লাহ নিজেই দিলেন
যখন আবু লাহাব নবীজিকে কষ্ট দিয়েছিল, তখন আল্লাহ নিজেই তার প্রতিবাদে ওহি নাজিল করলেন- ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, ধ্বংস হোক সে নিজেও।’ (সুরা লাহাব: ১)
আল্লাহ আরও বলেন- ‘বিদ্রূপকারীদের মোকাবিলায় আমি তোমার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা হিজর: ৯৫)
৭. সর্বোচ্চ চরিত্রের সনদ
প্রিয় নবীর চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা স্পষ্ট- ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম: ৪)
এ এমন এক সার্টিফিকেট, যা কোনো রাজা বা সম্রাট দিতে পারেন না। এটি দিয়েছেন আসমান-জমিনের স্রষ্টা স্বয়ং।
৮. আল্লাহ ও ফেরেশতারা যাঁর জন্য দরুদ পাঠ করেন
প্রিয় নবীর মর্যাদা এমন যে, স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারাও তাঁর জন্য দরুদ পাঠ করেন। এবং সমগ্র উম্মতকে সে আদেশ দিয়েছেন- ‘আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফেরেশতারা নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁকে সালাম জানাও।’ (সুরা আহযাব: ৫৬)
উপসংহার: আমাদের প্রাণের নবী
মুহাম্মদ (স.) শুধু একজন নবী নন; তিনি মানবতার মুক্তিদূত, ন্যায় ও আলোর পথপ্রদর্শক, আসমান-জমিনের মালিকের সর্বাধিক প্রিয় হাবিব। তাঁর তুলনা কেবল তিনি, আর তাঁর মর্যাদা আল্লাহর ইচ্ছায় সীমাহীন। চলুন আমরা সর্বদা তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও অনুসরণের অঙ্গীকার নবায়ন করি। তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করি- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
তিনি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম। তাঁর স্মরণে হৃদয় ভিজে যায়, তাঁর আদর্শে জীবন পায় আলোকিত পথ। তিনি আমাদের নবী, আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। চলুন, তাঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখে নয়, আমাদের চরিত্র, আমল ও জীবনাচরণে ফুটিয়ে তুলি। তাঁর আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলি শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।