প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্কট: বেতন-মর্যাদার প্রশ্ন ও গোঁয়ার্তুমি
জাকিরুল ইসলাম
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের লাগাতার কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের যে কঠিন পথ বেছে নিতে হয়েছে, তা কেবল আর্থিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি মর্যাদা ও আত্মসম্মানের এক গভীর সঙ্কট। যে শিক্ষকেরা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার ভিত্তিস্থাপন করেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের এমন উদাসীনতা ও উপেক্ষা নিঃসন্দেহে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের এই সময়ে, শিক্ষা-প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোঁয়ার্তুমি ও হুমকি-ধামকির কৌশল চরম সমালোচনার দাবি রাখে।
মর্যাদাহানি ও আর্থিক বৈষম্য:
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ সহকারী শিক্ষকই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এবং অতিরিক্ত ডিপিএড (Diploma in Primary Education) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অথচ তাঁদের বেতন স্কেল ১৩তম গ্রেডে আটকে আছে। এর বিপরীতে, অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন ডিপ্লোমাধারীরাও (যেমন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা হাসপাতালের নার্স) দশম গ্রেডের বেতন পান। এমনকি সরকারি একজন ড্রাইভারের বেতনও অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষকের চেয়ে বেশি।
আর্থিক বৈষম্য যখন মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়, তখন তা আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের নিজস্ব অফিসের কেরানি পদোন্নতি পেয়ে যখন অফিসার হন, তখন সেই শিক্ষকদেরই তাঁদের 'স্যার' বলে সম্বোধন করতে হয়। পদোন্নতিহীন এই পেশায় বছরের পর বছর ধরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেও একই পদে থেকে যাওয়া এবং কম বয়সী, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অধীনে কাজ করতে গিয়ে বয়স্ক শিক্ষকদের যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, তা কেবল হতাশার জন্ম দেয়। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান না জানিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শতভাগ পদোন্নতি ঠেকিয়ে রাখা শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে এক বিরাট বাধা।
এই নিম্ন বেতন ও মর্যাদার কারণে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখান না। যারা আসেন, তারাও সুযোগ পেলে চাকরি ছেড়ে চলে যান। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হলো পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি; এখানে সবচাইতে মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক দরকার। বেতন-ভাতা কম হলে এবং সংসারে অভাব-অনটন থাকলে শিক্ষকদের পক্ষে ক্লাসে আন্তরিকতা ধরে রাখা কঠিন। তাঁরা বাধ্য হন বাড়তি আয়ের জন্য অন্য পেশায় যুক্ত হতে, যা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোযোগ এবং প্রস্তুতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। শিক্ষার মান বাড়াতে বিনিয়োগের নামে অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ বা নির্বিচারে ধনী-গরীব নির্বিশেষে উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই বিতরণের চেয়ে মেধাবী শিক্ষক ধরে রাখা ও তাঁদের উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া যে বেশি জরুরি, সরকার সেই সত্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আন্দোলনের মুখে প্রশাসনের কৌশল: প্রতিশ্রুতিভঙ্গ ও হুমকি:
শিক্ষকদের এই চরম হতাশা থেকেই জন্ম নিয়েছে লাগাতার কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের কঠোর কর্মসূচি। শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন—এই সবকিছুর দায়ভার সরকারের উদাসীনতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ওপরই বর্তায়।
শিক্ষকদের আন্দোলন থামাতে কর্তৃপক্ষ ১১তম গ্রেড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। শিক্ষকেরা এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না দেখে এটিকে আন্দোলন থামানোর কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
এর চেয়েও নিন্দনীয় হলো শিক্ষা প্রশাসনের বর্তমান কৌশল। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে সরকার উল্টো হুমকি-ধামকি, শোকজ এবং ফৌজদারি মামলার ভয় দেখাচ্ছে। কর্মবিরতি প্রত্যাহার না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার যে ঘোষণা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়েছে, তা শিক্ষকদের দাবির প্রতি প্রশাসনিক গোঁয়ার্তুমির চরম বহিঃপ্রকাশ। বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে এভাবে জোর করে কাজে ফেরানোর চেষ্টা কিংবা চাকরিচ্যুত করার হুমকি কেবল পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে। শিক্ষকেরা ভয় না পেয়ে বরং আন্দোলনে অনড় থাকার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
করণীয়: হুমকি নয়, সম্মানের সমাধান:
চরম বিশৃঙ্খলার এই পরিস্থিতিতে সরকারকে অবশ্যই উল্টো পথে হাঁটা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং একটি উন্নত জাতি গড়ার অঙ্গীকার মাথায় রেখে অবিলম্বে শিক্ষকদের প্রতি নরম সুর গ্রহণ করা উচিত।
শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আলোচনায় বসে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ১১তম গ্রেডের প্রতিশ্রুতি দ্রুত প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে হবে।
সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডের দাবির বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
পদোন্নতি নিয়ে জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির ব্যবস্থা করে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মেধার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।
শিক্ষকদের হুমকি-ধামকি দিয়ে কিংবা আইনগত ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করা যাবে না। এতে কেবল শিক্ষকদের মনে ক্ষোভ বাড়বে এবং শিক্ষার পরিবেশ আরও বিষাক্ত হবে। সরকারের উচিত শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা এবং এই বিনিয়োগের মূল স্তম্ভ—শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা ও পদোন্নতির যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে তাঁদের কাজে আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনা। শিক্ষকদের দাবি মেনে নিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই একমাত্র বুদ্ধিমত্তার কাজ। প্রশাসনকে বুঝতে হবে, প্রাথমিক শিক্ষকরা জাতির নির্মাতা; তাঁদের প্রতি অবহেলা জাতির মেরুদণ্ডকেই দুর্বল করবে।
লেখক : শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।