১৭ মিনিটের বক্তব্য : কার জন্য কী বার্তা ছিল

১৭ মিনিটের বক্তব্য : কার জন্য কী বার্তা ছিল

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান

তারেক রহমানের বক্তব্যটি আমি বারবার শুনেছি। কারণ একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি বুঝতে চেয়েছি—এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনগণকে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কী নির্দেশনা রেখেছেন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য কী ধরনের দায়িত্বের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করেছি—আগামী দিনে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে, তবে তিনি কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান। এই বক্তব্যে তিনি সেই বিষয়েও একটি পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর একটি পরিকল্পনা আছে।

এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে কোনো প্রতিহিংসার কথা ছিল না, কোনো প্রতিশোধের ভাষা ছিল না। তিনি একবারের জন্যও অভিযোগের রাজনীতিতে যাননি। কেন তাঁকে ১৭ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে, কেন তাঁর বিরুদ্ধে ৭৫টি মামলা দেওয়া হয়েছিল, কেন নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁর কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, কেন তাঁর ভাইকে মরতে হলো, কেন তাঁর মাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, কেন তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছিল—এই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনার কোনো কথাই তিনি বলেননি।

অথচ এসব বলার সুযোগ তাঁর ছিল। কারণ এসবই তাঁর জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু তিনি সেই পথে যাননি। কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রচার বা পাল্টা বক্তব্যেও তিনি মনোযোগ দেননি।

প্রকৃতপক্ষে একজন জনগণের রাষ্ট্রনায়ক এসব বিষয়ে মনোযোগ দেন না। তাঁর বক্তব্যে কোনো আবেগতাড়িত উচ্চারণ ছিল না, কোনো স্বজন হারানোর করুণ বর্ণনা ছিল না, কোনো চেতনানির্ভর কথন ছিল না। পুরো বক্তব্যে কোনো নেতিবাচক উপাদান পাওয়া যায় না। এটি ছিল সম্পূর্ণ ইতিবাচক, নির্মাণমূলক এবং ভবিষ্যত্মুখী একটি বক্তব্য। তাঁর বক্তব্যের ভেতরে ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা।

মানুষ যে ভরসা খুঁজছিল, সেই ভরসার ভাষা তারা পেয়েছে, আস্থা পেয়েছে। যাঁরা গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনেছেন, তাঁরা নিজের মনের কথার সঙ্গে তাঁর কথার মিল খুঁজে পেয়েছেন—এই বিষয়টি তাঁরা উপলব্ধি করেছেন।

এই বক্তব্যে ছিল দেশের মানুষের কথা। ছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা। ছিল সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের কথা। ছিল নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের স্মৃতি। ছিল চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা, জীবন উৎসর্গের কথা, ত্যাগের কথা। শহীদ হাদির কথা তিনি বলেছেন। রক্তের ঋণের কথা বলেছেন। পাহাড়ের মানুষের কথা এসেছে, সমতলের মানুষের কথাও এসেছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার কথা ছিল, শিক্ষার কথা ছিল। বেকার তরুণদের হতাশার কথা ছিল। নারী ও শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল।

তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলিম—সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির কথা বলেছেন। মানুষের কথা বলার অধিকার ফিরে পাওয়ার কথা বলেছেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকারের কথা বলেছেন। সবাই মিলে দেশ গড়ার কথা বলেছেন। একটি নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের কথা ছিল। প্রতিবন্ধী, হতদরিদ্র মানুষের কথা ছিল। কৃষক-শ্রমিকের কথা ছিল। তিনি ‘জনগণের রাষ্ট্র’-এর কথা বলেছেন—যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকবে জনগণের প্রতি নিবেদিত। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।

তিনি বলেছেন, বিভিন্ন আন্দোলনে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, সেই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। কিন্তু সেই শোধ প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়, শোধ করতে হবে একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলে। তিনি ধৈর্যধারণ করার কথা বলেছেন।

শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল তাঁর বক্তব্যের একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বারবার বলেছেন, ধীর ও শান্ত থাকতে হবে। দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য তাঁর একটি পরিকল্পনা আছে—এই কথাটি তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমের কথা বলেছেন। আল্লাহর রহমতের কথা বলেছেন।

সব শেষে তাঁর বক্তব্য এসে দাঁড়িয়েছে দেশের মাটি ও মানুষের প্রশ্নে। তিনি বলেছেন,     ‘আমরা যে ধর্মের মানুষই হই, আমরা যে শ্রেণির মানুষই হই, আমরা যে দলের রাজনৈতিক কর্মী হই বা একজন নির্দলীয় নাগরিক হই—আমাদের সবাইকে যেকোনো মূল্যে এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলাকে ধরে রাখতে হবে। যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিত্যাগ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে—মানুষ যেন নিরাপদ থাকে।’

তিনি বলেছেন, ‘সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব, যা একজন মা দেখেন; যেখানে একজন নারী, একজন শিশু বা একজন পুরুষ—যেই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরে আসতে পারে।’ এ বক্তব্য জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

মোটের ওপর, এই ১৭ মিনিটের বক্তব্যে ইতিহাস, গণতন্ত্র, শান্তি, সংহতি, নিরাপত্তা, ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার সব উপাদান একত্রে মিশে আছে। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যা শান্তিপূর্ণ, অহিংস ও সহনশীল—যেখানে মতভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, কিন্তু রক্তপাত থাকবে না। এই অবস্থান বাংলাদেশের বিভাজনমূলক ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

তারেক রহমানের চিন্তাধারা সবার জন্য সমান সুযোগ, অধিকার এবং বিচার নিশ্চিত করার দিকে নিবদ্ধ। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা সব সময় গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানের মানবাধিকার রক্ষায় অবিচল। তিনি সব সময় মানবাধিকারের গুরুত্ব এবং জনগণের কল্যাণের কথা বলতেন। যেমন তাঁর এক উক্তি, ‘এটা আমাদের দায়বদ্ধতা, দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা, যেন সব মানুষের সমান সুযোগ এবং অধিকার নিশ্চিত হয়।’

তারেক রহমানের ‘সবার বাংলাদেশ’ এই সময়ের গণতান্ত্রিক বোধের অন্তর্নিহিত চেতনা; যেখানে থাকবে না কোনো গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আধিপত্য, থাকবে না রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দখলদারি হঠকারিতা; যেখানে সবাই সমান মর্যাদা পায়, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, আর উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যায় সমাজের শেষ প্রান্তিক মানুষের কাছেও; যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্কহীনতার কঠিন অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। সেই বাস্তবতার আলোকে রাষ্ট্র ও জনগণের গণতান্ত্রিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের যে যাত্রা, তার একটি দৃশ্যমান সূচনা ঘটেছে তারেক রহমানের ১৭ মিনিটের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। এই যাত্রার মূল হাতিয়ার এখন নির্বাচন। কারণ নির্বাচনই রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, গণতন্ত্রকে কার্যকর কাঠামোতে পরিণত করে।

বক্তব্যের আগে মঞ্চে উঠে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছে—তাঁর জন্য রাখা আলাদা নেতা আভিজাত্যের চেয়ার সরিয়ে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসলেন তারেক রহমান। এটি দলের নেতাকর্মীদের জন্য এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তাকে বোঝার জন্য তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ—‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাঁদেরকে, যাঁদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, অর্থাৎ আপনারা—এই মানুষগুলো, যাঁদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া উৎসর্গ করেছেন নিজের জীবন...সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। এবং সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি, টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে যাঁরা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের সামনে।’

এই বক্তব্যে তিনি নেতা বা ক্ষমতাশালী হিসেবে কোনো বিশেষ সুবিধা চান না, বরং তিনি জনগণকে, সাধারণ মানুষকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, অনুভব করছেন। এরপ আগে তিনি একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, ক্ষমতা, আভিজাত্য বা পদ-পদবি নয়, জনগণই প্রকৃত শক্তি।

২৭ ডিসেম্বর জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। স্বাক্ষরের সময় নিজের পরিচয় হিসেবে তিনি লিখেছেন—‘রাজনৈতিক কর্মী’। মাত্র একটি শব্দে তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও আত্মপরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি নিজেও ১৭ মিনিটের বক্তব্যের পথেই হাঁটছেন। রাজনৈতিক কর্মী লিখে তারেক রহমান দেখিয়েছেন, রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো পদ-পদবি বা ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি ধারাবাহিক অনুশীলন। যে কথা তিনি মঞ্চে বলেছেন—সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তা তিনি নিজের আচরণ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই অনুসরণ করছেন।

একই দিন সকালে তারেক রহমান যখন শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে যান, তখন দূর থেকেই এক ব্যক্তি, তাঁর নাম এ কে এম শহিদুল ইসলাম, তিনি অশালীন ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের লোক তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং কারাগারে পাঠানো হয়। বিষয়টি তারেক রহমানের নজরে আসতেই তিনি তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করেন এবং স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন—মত প্রকাশের কারণে কাউকে বন্দি রাখা যাবে না। পরবর্তী সময়ে এ কে এম শহিদুল ইসলামকে মুক্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।

এই ঘটনায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান আরো একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি প্রতিশোধ বা দমননীতি নয়, বরং মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়ানো একজন রাজনৈতিক কর্মী। এখানে ব্যক্তিগত অপমান নয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতির গণতান্ত্রিক বোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতাই ছিল মুখ্য।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ