নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত

নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত

প্রতিকী ছবি

পুঁজিবাজারে মন্দা। বিনিয়োগ পরিবেশ নেই। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা-বিনিয়োগেও টাকা খাটিয়ে লাভ পাওয়া কষ্টকর। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগের জন্য অনুকূল না।

তাই সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের উপকরণ সঞ্চয়পত্র। সেখানেও দফায় দফায় মুনাফার হার কমিয়ে গ্রাহকের লাভ কমানো হচ্ছে। এতে মানুষের আর নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা থাকছে না। এতে বিপাকে পড়ছেন মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা। উচ্চমূল্যের বাজারে আয় কমে যাওয়া আর জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দামের সময় ভোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন।

জানা যায়, ছয় মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আবারও কমানোর ঘোষণা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মুনাফার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকের আমানতের সুদহার বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের ওপর ১৫ শতাংশ আয়কর এবং হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কারণে গ্রাহকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

নামমাত্র সুদ প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ হলেও গড় মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ হওয়ায় প্রকৃত রিটার্ন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে ব্যাংকে টাকা রাখলে লাভের তুলনায় ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয়ের ঝুঁকিই বেশি।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টেনে ধরেছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হয়েছে। ফলে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে মানুষের মাঝে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বেশি দেখা দিয়েছে।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, পেনশনার গ্রুপ ও ঝুঁকিপূর্ণ বয়স্ক নাগরিকদের কাছে সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ কমতে শুরু করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের অন্যতম খাত সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোয় সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে।

সরকার ঘোষিত নতুন হার অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার হবে ১০.৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার হবে ৮.৭৪ শতাংশ। গত জুলাই মাসেও মুনাফার হার কমানো হয়েছিল। এখন ছয় মাস পর আবারও কমানো হলো। প্রতি ছয় মাস পর পর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কম। এ ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই পরিমাণ বা এর কম হলে মুনাফার হার বেশি হবে। সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কমে আসবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জুলাই-অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট দুই হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট ঋণ ঋণাত্মক ছিল প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। বহুদিন পর এই সূচকে উন্নতি লক্ষ করা গেছে। গত অক্টোবর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল তিন লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা।

এসব বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও তারল্য সংকটের কারণে পারিবারিক অর্থনীতির ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। বাস্তব আয় কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের বদলে দৈনন্দিন খরচকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এ ছাড়া কার্যকর মুনাফা কমে যাওয়া এবং কঠোর নিয়ম-কানুনও সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ কমিয়ে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং আস্থা ফিরে না এলে খুচরা সঞ্চয়পত্র সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দুর্বলই থাকবে।’

এদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডেও সুদের হার নিম্নমুখী। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ঋণ চাহিদা এখন কম। এর মধ্যে রেমিট্যান্স এবং বিদেশি ঋণ ছাড় বেড়ে যাওয়ার কারণে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। ডলারের দর যাতে বেশি না কমে, তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। এতে করে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে। এ অবস্থায় উদ্বৃত্ত টাকা ট্রেজারি বিল-বন্ডে অর্থাৎ সরকারকে ঋণ দিতে ব্যাংকের আগ্রহ বেড়েছে। আবার ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর প্রভাবে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহার দ্রুত কমছে। দীর্ঘদিন ১২ শতাংশের ওপরে থাকা সুদহার কমে এখন ১০ শতাংশের নিচে। এতে করে ব্যাংকের গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে গত অক্টোবরে তিন মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার নেমেছে ৯.৪৬ শতাংশে। এ ছাড়া ছয় মাস মেয়াদি বিলের সুদ ৯.৬৪ এবং এক বছর মেয়াদি বিলের সুদ ৯.৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সবগুলোর সুদহার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেও কোনো শান্তি নেই। মুনাফা তো দূরের কথা, উল্টো মূলধন হারিয়েছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। সিডিবিএলের তথ্য বলছে, বছরে বিও হিসাব কমেছে ৪২ হাজারের বেশি। শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়েছে। বিও রক্ষণাবেক্ষণ ফি এক-তৃতীয়াংশে নামানো হলেও বিনিয়োগকারীদের বাজার ছাড়ার প্রবণতা থামেনি। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে না পেরে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অন্তত ১১৭টি অফিস বন্ধ হয়েছে। অনেক জায়গায় বিনিয়োগকারীরা কার্যত লেনদেনের সুবিধাই হারিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্র্রতিক সময়ে ব্যাংক আমানতের সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে এক বছরের কম মেয়াদি আমানতের বিপরীতে গড় সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৯.৪৯ শতাংশ, আর এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতে গড় সুদহার হয়েছে ৯.৭২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক বছরের কম মেয়াদি আমানতের সুদহার ছিল ৯.২৪ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদি আমানতের সুদহার ছিল ৮.৯৮ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে গত দুই বছরে ব্যাংক আমানতের সুদহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে ব্যাংকারদের মতে, নামমাত্র সুদহার বাড়লেও বাস্তবে গ্রাহকের লাভ হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি ও কর বিবেচনায় নিলে ব্যাংকে আমানত রাখার ফলে বাস্তব ক্রয় ক্ষমতা বাড়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এ কারণেই ব্যাংকারদের মূল্যায়ন—বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক আমানত থেকে যে আয় পাওয়া যাচ্ছে, তা লাভের চেয়ে লোকসানের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।