নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করা গর্হিত কাজ

নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করা গর্হিত কাজ

ছবি: সংগৃহীত

মানুষের নাম পৃথিবীতে তার পরিচয় ধারণ করে। এটি কেবল কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়; বরং তা একজন মানুষের আত্মপরিচয়, ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের বাহক। মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেও তার নাম রয়ে যায় ইতিহাসে, স্মৃতিতে ও মানুষের মুখে মুখে। তাই একজন মানুষের কাছে তার সুন্দর নামটি হীরার চেয়েও মূল্যবান।
অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো; এই নাম নিয়েই আজকের সমাজে অনেক বেশি ব্যঙ্গ, উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চর্চা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বন্ধু মহলের আড্ডায় নাম বিকৃত করে ডাকাকে কোনো অপরাধই মনে করা হয় না।

আগে নাম বিকৃতির এই পরিধি ছিল ব্যক্তির পরিবার বা মহল্লার সীমায়। এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করা একধরনের সামাজিক বিনোদনে পরিণত হয়েছে। 

ইসলাম এই প্রবণতাকে সামান্য অপরাধ বা নিরীহ রসিকতা হিসেবে দেখেনি। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করাকে স্পষ্টভাবে মারাত্মক গুনাহ ও নিকৃষ্ট চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ বলে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— ‘হে ঈমানদাররা! কোনো মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোনো মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা যাদের উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর নারীরা যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে; কেননা যাদের উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)

এই আয়াত শুধু একটি নৈতিক উপদেশ নয়; এটি মুসলিম সমাজের জন্য এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা। পৃথিবীর আর কোনো মতবাদ বা আদর্শে এমন গভীর, হূদয়গ্রাহী ও সর্বগ্রাসী ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা পাওয়া যায় না, যা ইসলামে পাওয়া যায়। একজন মুসলিম আরেক মুসলিমের কাছে কেবল সমাজের সদস্য নয়; সে তার ভাই, তার সম্মানের অংশ, তার আত্মার প্রতিবিম্ব।

এই আয়াতের দাবি ও গুরুত্ব রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর অসংখ্য বাণীর মাধ্যমে সুস্পষ্ট করে তুলেছেন। জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার কাছ থেকে তিনটি বিষয়ের ওপর বাইআত নিয়েছিলেন— এক. সালাত কায়েম করব। দুই. জাকাত আদায় করব। তিন. প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করব। (বুখারি, হাদিস : ৫৫)

অন্য হাদিসে তিনি আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন: ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফুরি।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৪৪)
নাম বিকৃত করে কাউকে অপমান করা কি গালিরই আরেক রূপ নয়? অযৌক্তি ভাবে কাউকে হেয় করার  উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে হাসির ইমোজি বসিয়ে করা অপমান কি অপমান নয়?

রাসুল (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেছেন: ‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)
ব্যক্তির নাম, পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদা কি ইজ্জতের অন্তর্ভুক্ত নয়?

মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে সাহায্য করা পরিত্যাগ করে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে না। কোনো ব্যক্তির জন্য তার মুসলিম ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেয়ে বড় অপকর্ম আর নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৬/২৯৭, হাদিস : ৭৭৫৬)
এর পরও যদি আমরা কারো নাম নিয়ে উপহাস করি, তাকে অপছন্দনীয় উপাধিতে ডাকি, তার আত্মসম্মানে আঘাত করি; তবে তা কেবল সামাজিক অসভ্যতা নয়; বরং ঈমানি চেতনারও দুর্বলতা।

কাজেই কারো নাম বিকৃত করে তাকে বিব্রত করা, ব্যঙ্গাত্মক খেতাবে ডাকা কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মাধ্যমে হেয় করাকে ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। ইসলাম স্পষ্টভাবে অন্যের মনে কষ্ট হয়, এমন প্রতিটি কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে একে অন্যের প্রতি যথাযথ সম্মানবোধ, সংবেদনশীলতা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত আচরণ দান করার তাওফিক করুন। আমাদের জিহ্বা ও কলমকে হেফাজত করুন; যাতে তা কারো হূদয়ে ক্ষত সৃষ্টি না করে। আমিন।