কেন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত
ফাইল ছবি
যেকোনো সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। একটি সরকার যেভাবেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে।
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় সরকার। সংসদ হয় জবাবদিহির জায়গা। সংসদে বিরোধী দল এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের সব কার্যক্রম নজরে রাখে। যখন সরকার কোনো জনবিরোধী কাজ করে তখন বিরোধী দল সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে সেটা তুলে ধরে।
গণমাধ্যম সহজেই নির্বাচিত সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে পারে। এভাবেই একটি নির্বাচিত সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। অনির্বাচিত সরকারের সময় সংসদ থাকে না, কিংবা থাকলেও সেখানে বিরোধী দল থাকে প্রায় অস্তিত্বহীন।
সংসদের বাইরে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। একটি গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। তাই এ সরকার জনগণের নির্বাচিত ছিল না বটে, কিন্তু তারা জোর করেও ক্ষমতা দখল করেনি।
তারা জবরদখলকারী সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী ড. ইউনূসের অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। আরও সহজ করে বললে, জনগণের আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকার। তাই অন্য অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে এই সরকার সম্পূর্ণ আলাদা। অনির্বাচিত সরকারগুলো যেমন জবাবদিহির তোয়াক্কা করে না, কিংবা জবাবদিহি করতে অপছন্দ করে, এ সরকারের বেলায় তেমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। জনগণই সরকারকে যেহেতু ক্ষমতায় বসিয়েছে, কাজেই ড. ইউনূস সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহির নৈতিক বাধ্যবাধকতা ছিল।
কিন্তু ১৮ মাসে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনেক কার্যক্রম, চুক্তি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সরকার এসব অভিযোগ আমলে নেয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাবদিহিও ছিল না গত ১৮ মাস। ড. ইউনূস সরকার জন আন্দোলনের ফসল হলেও এ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেত গণমাধ্যম। সরকারের সমালোচনা করলেই নানানরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব সমালোচনার জবাব দেওয়া হয়নি অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে। নাগরিক সমাজ এক বছর পর সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু করেছিল বটে, কিন্তু সদ্য বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকারের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল সব সমালোচনা উপেক্ষা করা। সরকার সুশীল সমাজের সমালোচনাগুলোর কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ফলে ১৮ মাস মেয়াদি অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ থাকলেও তার কতটুকু সত্য আর কতটা মিথ্যা, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দেশের স্বার্থে এটা জরুরি। কারণ তারা জনগণের করের টাকায় বেতন ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিয়েছে। তাদের কাজের মূল্যায়ন জনগণের স্বার্থে দরকার। প্রধান উপদেষ্টাসহ একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সুযোগসুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ কতটা সত্য তা যাচাই করা দরকার। ড. ইউনূস তাঁর এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কর মওকুফসহ নানান সুযোগসুবিধা নিয়েছেন। তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা উচিত। গত ১৮ মাসে একাধিক উপদেষ্টা এবং তাঁদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। এঁদের মধ্যে তিনজন সাবেক উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলোর তদন্ত থমকে আছে। এসব দুর্নীতির তদন্ত দ্রুত জনস্বার্থে শেষ করা উচিত। এ ধরনের অভিযোগ জিইয়ে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যাবে না। এ ছাড়া বিদায়ি সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পদ দেখভাল করছেন এবং সেসব বিক্রি করতে সহায়তা করেছেন। স্বচ্ছতার স্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। কারণ অন্তর্র্বর্তী সরকারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের জন্য এবং সুশীল সমাজ সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়ন নির্মোহ রাখার জন্য একটি তদন্ত করা প্রয়োজন।
অন্তর্র্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন করেছে তাদের মেয়াদে। এসব চুক্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার বিদেশের সঙ্গে যেসব জানা-অজানা চুক্তি করেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সেসব সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটা যাচাই করা দরকার। এমনকি প্রয়োজনে বাদ দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। অনেকেই কয়েকটি চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।
এসব তদন্ত ড. ইউনূস কিংবা তাঁর সুশীল উপদেষ্টাদের চরিত্রহননের জন্য নয়, বরং দেশের স্বার্থে করা দরকার। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত আবারও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৪তম) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্র্বর্তী সরকারও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলেই গঠিত হয়েছিল। তাই অন্তর্র্বর্তী সরকারের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে আগামীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকাঠামো তৈরি করা যায়। ড. ইউনূস সরকার কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল করেছে, সীমা অতিক্রম করেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেন আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় এসব বিষয়ে নজর দেওয়া যায়।
আমাদের দেশে এখন থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করবে। তাই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার আমলের একটি নির্মোহ ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত। এটি শুধু বিদায়ি সরকারের জবাবদিহির বিষয় নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সীমারেখা সুনির্দিষ্ট করার জন্যও জরুরি। আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে যেন সীমা লঙ্ঘন করতে না পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে যেন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে, সেজন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করার জন্য ইউনূস সরকারের ওপর কমিশন গঠন করা উচিত। অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড তদন্ত হলে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।