গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে হলে

গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে হলে

সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ২০ জুলাই ২০২৬, সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠকে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা আরো উন্নত ও সহজ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেভাবেই হোক গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে হবে। তাদের জন্য সন্তোষজনক চিকিৎসা সেবা ও পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে যেন কোনো ভোগান্তি ছাড়াই সবাই সহজে চিকিৎসা পান এবং চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও যেতে না হয়। সরকারি হাসপাতালই যেন মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে (সূত্র: ইত্তেফাক, ২১ জুলাই ২০২৬)।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ প্রান্তিক ও গ্রামের মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ব্যাপারটি অগ্রাধিকার দেবার জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরন করতে হলে আমাদের বিশ্লেষন করতে হবে কেন এতদিনে এটি অর্জিত হয়নি এবং অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা সমূহ। আমাদের সরকারি গ্রামীন স্বাস্থ্যসেবা মূলত: দুইভাবে প্রদান করা হয়-মাঠকর্মী ও সেবাকেন্দ্র সমূহের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের দুই অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরদ্বয় সামন্তরালভাবে এই সেবা প্রদান করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠকর্মীগন হচ্ছেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত দল। পক্ষান্তরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীগন হচ্ছেন পরিবার কল্যাণ সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত দল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠকর্মীগণ টিকা প্রদান সহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতা ও প্রতিরোধ মূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচীর অগ্রসৈনিক। একইভাবে পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীগণ ছোট পরিবার গঠনের লক্ষ্যে সচেতনার সাথে গর্ভনিরোধক দ্রব্যাদি প্রদান করেন। উভয় অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের স্বীকৃত পদের শূন্য সংখ্যা অনেক। এই পদ সমূহ জনসংখ্যা ভিত্তিক। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যভাবে পদ সৃষ্টির প্রয়েজনীয়তা উপেক্ষিত হয়েছে বহুবছর। গ্রামের/প্রান্তিক মানুষের জন্য সচেতনতা ও প্রতিরোধ মূলক স্বাস্থ্যসেবা সহজ প্রাপ্য করতে হলে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টিসহ সমস্ত পদে নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে। এই সব মাঠকর্মীদের মাঝে তাদের বেতন কাঠামো সম্পর্কে অসন্তোষ রয়েছে। আলাপ-আলোচনা করে এই অসন্তোষ দূর করার ব্যবস্থা গ্রহন না করলে গ্রামীন স্বাস্থ্যসেবা হোচট খাবে। সাম্প্রতিক হামের প্রকোপ তারই একটা নমুনা মাত্র।

সেবাকেন্দ্রের মাঝে সবচে নীচে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। মাত্র ছয় মাসের (প্রকৃত পক্ষে ছয় সপ্তাহের) প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সি এইচ সি পি) দ্বারা পরিচালিত এই সেবাকেন্দ্র প্রকৃতপক্ষে ওষুধ বিতরন করে। দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক সি এইচ সি পি দ্বারা এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রেসক্রাইব করা যায় না। কমিউনিটি ক্লিনিক ও সি এইচ সি পিদের সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে অনেকগুলো সেবাকেন্দ্র-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র/রুরাল ডিসপেন্সারী, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সব ইউনিয়নে সব সেবাকেন্দ্র নেই। কোন কোন ইউনিয়নে একাধিক সেবাকেন্দ্র যেমন আছে, তেমনি কোন কোন ইউনিয়নে কোন সেবাকেন্দ্র নেই। অবিলম্বে ম্যাপিং করে প্রতি ইউনিয়নে নূন্যতম একটি সেবাকেন্দ্র নিশ্চিত করা দরকার। সব সেবাকেন্দ্রে সেবা প্রদানকারী একরকম নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেবাকেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদ থাকলেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্রে তেমনটি নেই। একইভাবে কোন কেন্দ্রেই ল্যাবরেটরী টেকনোলজিষ্টের পদ নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে দরকার একটি উপযুক্ত সেবাকেন্দ্র যা অধিকাংশ সাধারন রোগীর চিকিৎসা দিতে সক্ষম। গর্ভকালীন সেবা সহ সাধারন প্রসবের সেবা অপরিহার্য্য। তাই প্রয়োজন একটি উপযুক্ত সেবা প্রদানকারীদের কাঠামো প্রনয়ন ও সে অনুযায়ী ভৌত অবকাঠামো তৈরী, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ সরবরাহ। ইউনিয়ন কেন্দ্র আস্থার প্রতিক হলে সত্যিকার অর্থে প্রান্তিক/গ্রামীন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সহজ লভ্য হবে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্র বর্তমানে আছে কয়েক ধরনের। ১০ শয্যার, ৩১ শয্যার, ৫০ শয্যার আর ১০০ শয্যার। শয্যা সংখ্যার সাথে জড়িত অনান্য সুবিধা-জনবল বিশেষজ্ঞসহ, ওষুধ ও অনান্য বরাদ্দ ইত্যাদি। বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্র ১০১ শয্যার করবে। ১০০ নয় ১০১ কেন তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। যদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্র ১০০ শয্যার হয় এবং সেখানে নির্ধারিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদান করা যায় তাহলে অনেকাংশেই জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাপ কমবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্যত্র। সরকার আবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ খোলার ও জেলা ও অনত্র নতুন হাসপাতাল তৈরী বা বর্তমান হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির। যেহেতু আমাদের যথেষ্ট বিশেষজ্ঞ নেই আর যারা আছেন তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা জেলা হাসপাতালে থাকাটা অগ্রাধিকার দেন তাই উপজেলায় বিশেষজ্ঞ পাওয়া মুশকিল হবে এবং প্রান্তিক/ গ্রামের মানুষের কাৎখিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান বাধাগ্রস্থ হবে। এখনও আমরা সমস্ত উপজেলায় এ্যানেসথেসিওলজিষ্ট বিশেষজ্ঞ দিতে পারিনি, ফলে অস্ত্রোপচার ও সিজারিয়ান সেকশন করা সম্ভব হচ্ছে না। ৫০ শয্যার উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্রে হৃদরোগ, চক্ষু, নাক-কান-গলা, অর্থপেডিক্র, শিশুরোগ, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পদ থাকলেও এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা যাচ্ছে না তাই ঐসব সেবা থেকেও ওখানকার মানুষ বঞ্চিত। পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বা ডাক্তাররা যত গুরুত্ব পান, ততটাই অবহেলিত অনান্য জনবল। ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্রে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদে রয়েছে ৫ জন আর ৫০ শয্যাতে ৬ জন। বর্হিবিভাগ, অন্ত:বিভাগ, জরুরী সেবা ২৪/৭ ব্যাপী কিভাবে সম্ভব এই জনবলে? হাসপাতালের

টয়লেট নোংরা দেখে মন্ত্রী মহোদয় গোস্বা করে সুপারিনটেনডেন্টকে শাস্তি দেন কিন্তু খোজ নেন না পরিচ্ছন্নকর্মীর সংখ্যা নিয়ে। 

তাহলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত প্রান্তিক/গ্রামের মানুষের জন্য কোন ভোগান্তি ছাড়াই সহজে সরকারি সেবাকেন্দ্রে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হলে ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা জোরদার করতে হবে। মেডিকেল অফিসারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সাথে সাথে ল্যাবরেটরী টেকনলজিস্টের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ দিয়ে, যথেষ্ঠ ওষুধ ও অনান্য সামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। এ পর্যায়ে গর্ভবতী সেবা ও সাধারন প্রসবের ব্যবস্থাও করতে হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্রে সৃষ্ট সমস্ত পদে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হবে। সাথে সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যথাযথ জনবল নিয়োগ দিয়ে সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করে। হাসপতালের পরিচ্ছন্নতার জন্য যথেষ্ঠ সংখ্যক পরিছন্নকর্মীর পদ সৃষ্টি করে তাদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইউনিয়ন পর্যায়ে মেডিকেল অফিসার ও মিডওয়াইফের পদ ফাকা রেখে তাদের উপাজেলা বা অন্যত্র পদায়ন করা যাবে না। একইভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্রে বিশেষজ্ঞের পদ ফাকা রেখে তাদেরকে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদায়ন করা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ না, তবে অসম্ভবও কিছু না। পদায়নের দায়িত্ব থেকে মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তরকে সরে আসতে হবে। বিভাগীয় পরিচালকরা এ দায়িত্ব পালন করবেন এবং অধিদপ্তর এটি নিশ্চিত করবে যথাযথ তদারকীর মাধ্যমে।

ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ