সুন্দরবনের প্রান্তে সহনশীলতার চাষ: বস্তায় আদা চাষে ফাতেমা বেগমের সফলতা

সুন্দরবনের প্রান্তে সহনশীলতার চাষ: বস্তায় আদা চাষে ফাতেমা বেগমের সফলতা

ছবি: প্রতিনিধি

ফাতেমা বেগম খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ভোজনখালি গ্রামের একজন পরিশ্রমী গৃহিণী। তাঁর গ্রামটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন–এর একেবারে কাছাকাছি অবস্থিত। লবণাক্ততা, জোয়ারের পানি ঢুকে পড়া এবং সীমিত জীবিকাসংক্রান্ত সুযোগের কারণে এ অঞ্চলে জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ফাতেমার পাঁচ সদস্যের পরিবারটি মূলত তাঁর স্বামীর দিনমজুরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাসিক আয় ছিল প্রায় ৫,৬০০ টাকা, অথচ খরচ প্রায় ৬,০০০ টাকা—ফলে সঞ্চয় বা নতুন কিছুতে বিনিয়োগ করার সুযোগ ছিল না বললেই চলে।

পরিবারের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ানোর আশায় ফাতেমা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরএইচএল প্রকল্পে–এ যুক্ত হন। এই প্রকল্পের আওতায় তিনি বস্তায় আদা চাষের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং কারিগরি সহায়তা, অনুদান ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পান। পাশাপাশি তিনি মাটি প্রস্তুত, সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা ও ফসলের যত্নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশল শেখেন, যা লবণাক্ত ও উপকূলীয় এলাকায় সফল চাষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

নিজের ২০ শতাংশ বসতভিঁটার জমিতে ফাতেমা বস্তায় আদা চাষের জন্য জায়গা প্রস্তুত করেন, যাতে তাঁর বিদ্যমান সবজি বাগানের কোনো ক্ষতি না হয়। ১৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে তিনি বস্তায় আদা রোপণ করেন এবং পুরো মৌসুমজুড়ে নিয়মিত পরিচর্যা, পানি দেওয়া ও মাটির মান বজায় রাখেন। জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি থেকে ফসলকে সুরক্ষা দেওয়ায় বস্তায় চাষ পদ্ধতিটি তাঁর এলাকার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী প্রমাণিত হয় এবং সীমিত জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হয়।

২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি ফাতেমা সফলভাবে ৩৪ কেজি আদা সংগ্রহ করেন। এর একটি অংশ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারে খরচ হওয়ায় বাজার থেকে আদা কেনার প্রয়োজন কমে যায়। অবশিষ্ট আদা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে তিনি মোট ১০,২০০ টাকা আয় করেন, যা তাঁর পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয়। এই অর্থ দিয়ে তিনি দৈনন্দিন খরচ মেটানো, পুষ্টিকর খাবার ও ফল কেনা, নাতনির স্কুলের ফি সময়মতো পরিশোধ এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে সক্ষম হন—ফলে পরিবারের আর্থিক স্থিতি ও সামগ্রিক কল্যাণ স্পষ্টভাবে উন্নত হয়।

প্রথম মৌসুমের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ফাতেমা আগামী দিনগুলোতেও বস্তায় আদা চাষ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর এই গল্প দেখায়, কীভাবে বসতভিঁটা ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতি নারীদের ক্ষমতায়ন, খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং টেকসই জীবিকায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমনকি সুন্দরবনের নিকটবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাতেও। ফাতেমার সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের সহনশীলতাই বাড়ায়নি, বরং তাঁর গ্রামের অন্যান্য নারীদেরও আত্মনির্ভরশীলতা ও আয়বর্ধক উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করছে।