বুভুক্ষু সুশীলদের লুণ্ঠনের উপকথা

বুভুক্ষু সুশীলদের লুণ্ঠনের উপকথা

সংগৃহীত ছবি

আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো, শিক্ষিত মানুষ, বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী সৎ, পূতঃপবিত্র। তাঁরা সফেদ। ঠিক যেন সার্ফএক্সেল দিয়ে ধোয়া ঝকঝকে পরিষ্কার সাদা কাপড়ের মতো। সারাজীবন আমরা জেনে এসেছি, রাজনীতিবিদরা হলেন যত নষ্টের গোড়া।

রাজনীতিবিদদের কারণেই সর্বত্র দুর্নীতি। দেশে দুর্নীতির বিস্তারের জন্য রাজনীতিবিদরাই দায়ী-এমন কথা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অবিরাম বলতে বলতে আমাদের মোটামুটি মুখস্থ করিয়েছেন। সুশীল সমাজের নাক উঁচু গণ্যমান্যরা তাঁদের চিন্তাশীল লেখায়, ভাবগম্ভীর টকশোতে দেশের দুর্দশা নিয়ে হাহাকার করেন সারাক্ষণ। তাঁদের কথার সারমর্ম হলো, বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারছে না রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর আমলাদের জন্য।

এরাই দুর্নীতি আর লুটপাট করে দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সুশীলবোদ্ধাদের কথা শুনি। তাঁদের উথলে ওঠা দেশপ্রেম দেখে শিহরিত হই। মনে মনে ভাবি এত যোগ্য মানুষ থাকতে দেশটার কী দশা!

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

সুশীল শিরোমণি, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হলো সুশীল সমাজের সরকার। রাষ্ট্রের এত বছরের সব আবর্জনা এবং জঞ্জাল সাফ করে তাঁরা নতুন বাংলাদেশ তৈরি করবেন। আমরা তো খুশিতে আটখানা। উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হলো সফেদ সুশীলদের নিয়ে। তাঁরা এসেই নাক সিটকে বললেন, সবকিছু এত নোংরা হয়ে আছে, পরিষ্কার করতে সময় লাগবে।

শুধু দেশের এলিট সুশীল দিয়ে হবে না, বিদেশ থেকে সুশীলদের ভাড়া করে আনতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে এলেন সুশীল নতুন সংবিধান বানাতে। ইউরোপ থেকে এলেন আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি শেখাতে। বিদেশি বিনিয়োগ খুঁজতে আনা হলো উড়ন্ত মানব। রাষ্ট্রের সব জায়গায় বসানো হলো সুশীলদের পছন্দের লোকজন। দেশ যেন পূতঃপবিত্র, দুর্নীতিমুক্ত হয় সেজন্য আমরা হাততালি দিলাম। উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা দেশ। বাংলাদেশ এবার বদলে যাবে। তাঁরা কথা বলেন আমরা অবাক হয়ে শুনি।

কর্তা উপদেষ্টা বললেন, আমরা বিশ্বের কাছে যাব না, বিশ্ব আসবে আমাদের কাছে। সত্যি সত্যিই বিশ্বের দরজা বন্ধ হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখলে কেউ ভিসা দেয় না। তাতে কি প্রধান কর্তা এবার ভাগ্যবদলের মিশনে নামলেন। না, দেশের নয়, নিজের। নিজের মামলা থেকে আয়কর সবকিছু মাফ করিয়ে নিলেন ম্যাজিকের মতো। মসনদে বসে তিনি যেন পেলেন আলাদিনের চেরাগ। যা চান, তাই তাঁর কাছে হাজির হয় অবলীলায়। বিশ্ববিদ্যালয় নিলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিলেন। সাত জীবনের সব চাওয়া পূরণ করে নিলেন এক জীবনে। তিনি ১৮ মাসে কথা বললেন মানুষের জন্য, কাজ করলেন শুধু নিজের জন্য।

সুশীল শিরোমণি যে পথে, অন্য সুশীলরাও সেই পথে হাঁটবেন এটাই তো স্বাভাবিক। উপদেষ্টাদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল নিজেদের আখের গোছানোর প্রতিযোগিতা। কে কত দ্রুত বেশি ধনী হতে পারে তার প্রতিযোগিতা। কেউ সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করে ভাগ্য বদলাতে শুরু করলেন, কেউ প্লাস্টিক ব্যবহারের বিধিনিষেধ করে। কোনো উপদেষ্টা নিজের বাড়ির রাস্তা বড় করে দেখালেন তাঁর কত্ত ক্ষমতা। আবার কোনো উপদেষ্টা অস্তিত্বহীন নামসর্বস্ব থিয়েটারের নামে অনুদান দেওয়ার টাকা নিজের পকেটে রেখে দেখালেন, ক্ষমতা কত মধুর। ছোটরা বড়দের দেখে শেখে। শিশু উপদেষ্টারা যখন দেখলেন বড়রা নিজেদের ভাগ্যবদলে দেশ বদলাতে চাচ্ছেন। তখন তারাও শুরু করলেন টাকা বানানোর প্রতিযোগিতা। পদায়ন, টেন্ডার বাণিজ্য করে তারা নিজেদের বদলে ফেললেন। তাদের চেহারায় চকচকে ভাব এলো। গায়ে ঘামের গন্ধের বদলে ছড়িয়ে পড়ল পারফিউমের সুরভিত সৌরভ। সুশীল শাসনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগ দেওয়া হলো সুশীলদের। কারণ সুশীলরাই সব বোঝেন, আমরা আমজনতা কিছু বুঝি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হলো সুশীল সমাজের একজন উচ্চবংশীয় ব্যক্তিকে। তিনি এসে কালবিলম্ব না করে গোপনে টাকা ছাপালেন। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করলেন। মাত্র ১৮ মাসে দুবাইতে অর্ধশত কোটি টাকার বাড়ি বানিয়ে ফেললেন। তিনি শেখালেন কীভাবে শর্টকাটে অঢেল সম্পদ বানানো যায়। এক শিশু উপদেষ্টা টাকার বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কর্মসূচি চালু করলেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো নিলামে। ওয়াসার এমডি নিয়োগ দেওয়া হলো শতকোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে। যত বেশি টাকা তত ভালো পদ। ডিসি পদায়নের জন্য উন্মুক্ত নিলাম হলো। ডিসিপ্রত্যাশীদের চেক ঘুরে বেড়াতে থাকল উপদেষ্টাদের টেবিলে টেবিলে। যারা টাকা খরচ করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বা ওয়াসার এমডি হয়েছেন তাদের তো একমাত্র লক্ষ্য হলো, পদে বসে টাকা বানাও। তারা তাই করলেন। চারদিকে যেন টাকা উড়ছে। দেশের মানুষের অবস্থা যতই খারাপ হোক না কেন, কিছু মানুষের ভাগ্য তো রাতারাতি পাল্টে গেল, এইবা কম কী?

টাকা বানাও, ভাগ্য বদলাও-এটাই যেন অন্তর্বর্তী সরকারের মূল বাণী হয়ে গেল। আদালতপাড়ায় চলল মামলা বাণিজ্য। সম্প্রতি আইসিটির প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ যেন প?্যানডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। ১৮ মাসে জামিন বাণিজ্য ও মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে কত শত কোটি টাকার হাতবদল হয়েছে, তা খুঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা লাগবে। কিন্তু দুর্নীতির প্রবল স্রোতে গা ভিজিয়েছেন সুশীল রূপী সাংবাদিকও। সাংবাদিকতাবিষয়ক সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান পিআইবির সর্বোচ্চ পদে বসা সুশীলেরও তো ক্ষুধা পায়? চারপাশে যখন টাকার উৎসব তখন তিনি কেন সাধু সন্ন্যাসীর মতো চোখ বন্ধ করে থাকবেন। প্রশিক্ষণ না দিয়েই দুই দিনে তিনি পকেটে পুরেছেন ২৪ লাখ টাকা। ১৮ মাসে দেশের মানুষের ভাগ্য না বদলালেও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যারা নানাভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁদের ভাগ্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। এদের সম্পদ নিয়ে কথা  শুরু হলেই হাজার কোটি টাকার কথা শোনা যায়। বর্তমান মুখ্য সচিব এক বছর আগেই এসব সুশীলের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। তখন এই সৎ আমলার কথায় অনেকেই বিব্রত হয়েছিলেন। অনেকেই সুশীলদের বিরুদ্ধে এভাবে মন্তব্য করায় মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু ১৮ মাস পর দেখা যাচ্ছে, তিনি যা বলেছেন তা ছিল বরফ স্ত‘পের উপরিভাগ মাত্র। ১৮ মাসে সুশীল সমাজের লুণ্ঠনের উপকথা আরব্য রজনিকেও হার মানাবে।

আমাদের সুশীল সমাজ গত ১৮ মাসে দুটি জিনিস প্রমাণ করেছেন- প্রথমত, সুশীলরা রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁদের সামনে মধু, তারা চেখে দেখবেন না, তা কী করে হয়? তাঁরা ক্ষমতায় বসে দেখেছেন, টাকা বানানোর অবারিত সুযোগ। এ সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন ক্ষমতার চারপাশে থাকা সুশীলরা।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিতে সুশীলরা রাজনীতিবিদ বা আমলাদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। রাজনীতিবিদ বা আমলারাও দুর্নীতি করেন, কিন্তু খানিকটা রয়ে-সয়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্ষমতায় বসে সুশীলরা নিজেদের আখের গোছাতে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। যে যেখানে যেভাবে পেরেছেন লুট করেছেন। সুশীলদের এই অতি দানবীয় ক্ষুধা দেশটার বারোটা বাজালেও দেশের মানুষের একটা বড় লাভ হয়েছে, তা হলো সুশীলরা ক্ষমতা পেলে কতটা লোভাতুর হতে পারে তা নয়ন ভরে দেখেছে।