সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিসকাউন্ট ফাঁদ!

সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিসকাউন্ট ফাঁদ!

সংগ্রহীত ছবি

এক জোড়া চাকার দামে মিলছে পুরো একটি ইলেকট্রিক বাইক! ঈদ উপলক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার ই-বাইক বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ টাকায়। আবার লাখ টাকার মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছে ৫-৬ হাজারে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভার্চুয়াল বাজার এমন অবিশ্বাস্য ‘ডিসকাউন্ট’ অফারে ছেয়ে গেছে। আর এ লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন অসংখ্য ক্রেতা।

তড়িঘড়ি করে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে শেষে পণ্য তো মিলছেই না, উল্টো টাকা ফেরত চাইলে শুনতে হচ্ছে দুর্ব্যবহার।

ঈদকে ঘিরে অনলাইন কেনাকাটার চাহিদা বাড়ার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। অস্বাভাবিক মূল্যছাড়ের প্রলোভনে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অল্প অল্প টাকা হাতিয়ে নিয়ে বড় অঙ্কে পরিণত করছে তারা। সম্প্রতি প্রতারণার শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাকার পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেকেই থানায় অভিযোগ করছেন না; কেউ কেউ লজ্জায় বিষয়টি কাউকে জানাচ্ছেন না।

এক ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বিডি স্মার্ট ইলেকট্রিক বাইক স্টোর’ নামে একটি ফেসবুক পেজে ঈদ উপলক্ষে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে ই-বাইক বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়- ৪৮ ভোল্ট ২০ অ্যাম্পিয়ার লিথিয়াম ব্যাটারি, এক চার্জে ৭০-৮০ কিলোমিটার চলার সক্ষমতা, ৭০০ ওয়াট মোটর, ডিস্ক ও ড্রাম ব্রেকসহ নানা আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। দাম ধরা হয় মাত্র ৮ হাজার ৫০০ টাকা। অর্ডার নিশ্চিত করতে অগ্রিম ১ হাজার ৩৫০ টাকা পাঠানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

একই ধরনের অফার দেখা গেছে ‘বিডি ইলেকট্রিক বাইক’, ‘স্মার্ট রাইড জোন’সহ আরও অনেক পেজে।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ই-বাইকের শুধু ব্যাটারির বাজারমূল্যই ২৪-২৬ হাজার টাকা, মোটরের দাম ২০-২৫ হাজার টাকা এবং টায়ারের দামই ৬-৮ হাজার টাকা। ফলে এমন দামে পণ্য বিক্রি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে যখন অনেকের মাথায় ই-বাইক কেনার বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে, সেই সময়টিকেই প্রতারণার জন্য ‘মোক্ষম সময়’ হিসেবে বেছে নিয়েছে চক্রটি।

শুধু ই-বাইক নয়, ২০ হাজার টাকার সাইকেল ২ হাজার ৫০০ টাকায়, লাখ টাকার স্মার্টফোন কয়েক হাজার টাকায়, এমনকি প্রাইভেটকার, ট্রলিব্যাগ ও পোশাকেও ৮০-৯০ শতাংশ ছাড়ের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। ক্রেতারা যোগাযোগ করলে ‘অফার শেষ হয়ে যাবে’- এমন চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত বিকাশ বা নগদে আংশিক টাকা পাঠাতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পরপরই বন্ধ হয়ে যায় সব যোগাযোগ।

প্রতারকরা সরাসরি ঠিকানা দিতে গড়িমসি করে। ক্রেতার দেওয়া ঠিকানার বিপরীতে দূরবর্তী বা অস্পষ্ট লোকেশন দেখিয়ে হোম ডেলিভারির কথা বলে অগ্রিম টাকা আদায় করা হয়। কখনো ভুয়া শোরুমের ঠিকানাও দেওয়া হয়, যা বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায় না। একাধিক নম্বর ব্যবহার করে তারা যোগাযোগ চালিয়ে যায় এবং বারবার ফোন করে অর্থ পাঠাতে চাপ সৃষ্টি করে। 

গত মঙ্গলবার রাতে বিডি স্মার্ট ইলেকট্রিক বাইক স্টোর নামের পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে ডেলিভারি ঠিকানা ও ২০ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি চার্জবাবদ ১ হাজার ৩৫০ টাকা পাঠাতে বলে। টাকা পাঠাতে ০১৮৬২-২৭৯৩৫৬ (বিকাশ) ও ০১৯৭২-১৯০৭৬৫ (নগদ) নম্বর দেয়। শোরুমে গিয়ে কিনতে চাইলে জানায়, রাত ১টার পর অফার থাকবে না। তারা শোরুমের এমন একটি ঠিকানা দেয়, যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৫০০ টাকার বেশি পাঠাতে পারব না জানালে তাতেও রাজি হয়। ৪-৫ ঘণ্টায় মোট ছয়টি নম্বরে তাদের সঙ্গে কথা হয়। বাকি নম্বরগুলো ০৯৬৩৮-২৬৫৯৬০, ০১৩৩৫-৭৯১২৭৬, ০১৯৭২-১৯০৭৬৫ ও ০১৩৪০-৮৬০৯৮৭। 

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতারণা মূলত সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিজ্ঞাপনের নিচে ভুয়া ইতিবাচক মন্তব্য দিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা হয়। তাই অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য দেখলে সতর্ক থাকার পাশাপাশি কোনো অবস্থাতেই অগ্রিম টাকা পাঠানো উচিত না। থানায় অভিযোগ দিতে হবে। প্রতারকচক্র যেহেতু মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও বিভিন্ন অপারেটরের ফোন নম্বর ব্যবহার করে, এগুলোর জন্য তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ ব্যক্তিগত দিতে হয়; ফোনগুলোও সচল, তাই সঠিক তদন্ত হলে প্রতারকদের শনাক্ত করা কঠিন কাজ নয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘অনলাইন বাণিজ্য তদারকির নির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় প্রতারণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মোবাইল সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায়ও দুর্বলতা রয়েছে। সম্প্রতি ৫১ হাজারের বেশি সিমসহ একটি প্রতারকচক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিমগুলো ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত ছিল। একই সমস্যা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেও রয়েছে।’ 

তিনি আরো জানান, সাইবার টিম নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালাচ্ছে। তবে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিস্টেমগত পরিবর্তন জরুরি।