মহাকাশে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু যুদ্ধের মহড়া, বড়সড় বিপদ আসছে?

মহাকাশে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু যুদ্ধের মহড়া, বড়সড় বিপদ আসছে?

ছবিঃ সংগৃহীত।

মহাকাশে রাশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে মার্কিন সামরিক মহড়ার মাধ্যমে।সম্প্রতি মার্কিন স্পেস কমান্ড 'অ্যাপোলো ইনসাইট' নামক একটি বিশেষ টেবিলটপ ওয়ারগেম (যুদ্ধকালীন মহড়া) সম্পন্ন করেছে। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিল মহাকাশে রাশিয়ার সম্ভাব্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং তার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলা করা।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া মহাকাশে এমন এক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ব্যবস্থা তৈরি করছে যা পারমাণবিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস তৈরি করতে সক্ষম।

এই তরঙ্গ মহাকাশে থাকা শত শত সামরিক ও বেসামরিক স্যাটেলাইট মুহূর্তেই অকেজো করে দিতে পারে। এর ফলে পৃথিবীজুড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং ব্ল্যাকআউট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উৎক্ষেপণ করা রাশিয়ার 'কসমস ২৫৫৩' স্যাটেলাইট। এটি মহাকাশের এমন এক উচ্চতায় (প্রায় ২,০০০ কিমি) অবস্থান করছে যা সাধারণত অব্যবহৃত থাকে।

মস্কো একে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বললেও, ওয়াশিংটন মনে করে এটি আসলে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম। এই কক্ষপথের উচ্চ বিকিরণ মার্কিন গোয়েন্দাদের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।

মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার এবং স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল রিচার্ড কোরেল সতর্ক করেছেন, বর্তমান জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল মহাকাশের এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নয়। তাদের মতে, রাশিয়া এবং চীন মহাকাশ ডোমেইনে যে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতিতে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।

গত ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত এই মহড়ায় কেবল মার্কিন স্পেস কমান্ড নয়, বরং অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মতো বন্ধুরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। এছাড়া মহাকাশ খাতের ৬২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থা যেমন নাসা এবং ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি এতে অংশগ্রহণ করে। বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব এই মহড়াকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে দুই ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। প্রথমত, বিস্ফোরণের সরাসরি দৃষ্টিসীমায় থাকা স্যাটেলাইটগুলো ধ্বংস হবে।

দ্বিতীয়ত, ভ্যান অ্যালেন বেল্টে আটকে পড়া উচ্চ বিকিরণ কয়েক মাস ধরে অন্যান্য স্যাটেলাইটগুলোকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেবে। এতে করে লো আর্থ অরবিট দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

মহাকাশের তিনটি প্রধান স্তরেই এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। এলইও স্তরে বিস্ফোরণ হলে বাণিজ্যিক খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে। মিডিয়াম আর্থ অরবিটে হামলা হলে জিপিএস ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আর জিওস্টেশনারি অরবিটে বিস্ফোরণ ঘটলে সামরিক কমান্ড, কন্ট্রোল এবং ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, যা কৌশলগত প্রতিরক্ষাকে পঙ্গু করে দেবে।

মার্কিন স্পেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং স্পষ্ট করেছেন, মহাকাশ এখন আর কেবল একটি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র নয় বরং এটি যুদ্ধের পরবর্তী ময়দান। ২০২৬ সাল জুড়ে 'অ্যাপোলো ইনসাইট' সিরিজ অব্যাহত থাকবে, যেখানে কক্ষপথের কৌশলগত যুদ্ধ এবং সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নিয়ে আরও তিন দফায় মহড়া চালানো হবে। মহাকাশে এই নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।