রোবটের কাছে রুশ সেনাদের আত্মসমর্পণ, এরপর কি?

রোবটের কাছে রুশ সেনাদের আত্মসমর্পণ, এরপর কি?

ছবিঃ সংগৃহীত।

দুই সেনাসদস্য হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণ করছেন এবং প্রতিপক্ষের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন।তবে এবারের দৃশ্যপটে একটি বড় চমক রয়েছে। সেখানে কোনো রক্তমাংসের মানুষ বা বিজয়ী সেনা উপস্থিত ছিল না। তার বদলে দুই রুশ সেনা আত্মসমর্পণ করছিলেন ইউক্রেনীয় ল্যান্ড রোবট (স্থল ড্রোন) এবং আকাশপথের ড্রোনের কাছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক মাইল দূর থেকে নিরাপদ অবস্থানে বসে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন একজন ইউক্রেনীয় পাইলট। আধুনিক যুদ্ধকৌশলের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয় বরং ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

ইউক্রেনীয় ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা 'মাকার' জিনকেভিচ এই অভাবনীয় অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে সিএনএনকে জানান, একটি গুলি খরচ না করেই তারা রুশ অবস্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। তার পরিচালিত ‘এনসি১৩’ ইউনিটটি মূলত স্থলভিত্তিক রোবটিক স্ট্রাইক সিস্টেম নিয়ে কাজ করে।

গত গ্রীষ্মে পরিচালিত এই অভিযানটিকে ইতিহাসের প্রথম ঘটনা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, যেখানে কোনো পদাতিক সৈন্যের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই ড্রোন এবং রোবট ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে বন্দি করা হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ইউক্রেনের আকাশে ড্রোন বা ড্রোনের উপস্থিতি একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তবে ড্রোনের মাধ্যমে পদাতিক বাহিনীর ওপর আকাশ থেকে আক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় ইউক্রেন এখন স্থল ড্রোনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চাকা বা ট্র্যাকের ওপর ভর করে চলা এসব রিমোট-কন্ট্রোলড যানবাহন আগে মূলত আহত সৈন্যদের উদ্ধার বা রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হতো।

কিন্তু বর্তমানে এগুলো সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নিচ্ছে এবং শত্রুর বাঙ্কারে আক্রমণ চালাচ্ছে। আকাশপথের ড্রোনের তুলনায় এই স্থল ড্রোনগুলো অনেক বেশি ওজন বহন করতে পারে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে সক্ষম।

প্রযুক্তিগত এই অগ্রগতির একটি বড় উদাহরণ হলো ইউক্রেনের থার্ড আর্মি কোরের একটি ল্যান্ড রোবট, যা মাত্র একবার চার্জ দিয়ে এবং সামান্য রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে টানা ৪৫ দিন একটি রুশ অগ্রযাত্রাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। কমান্ডার জিনকেভিচ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জনশক্তির দিক থেকে রাশিয়ার সাথে পাল্লা দেওয়া ইউক্রেনের জন্য কঠিন। তাই তারা সংখ্যার অভাব মেটাতে প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে বেছে নিয়েছেন।

তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো চলতি বছরের মধ্যেই রণক্ষেত্রের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ পদাতিক সৈন্যের কাজ রোবট এবং ড্রোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, যাতে করে অমূল্য মানবজীবন রক্ষা পায়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি এক ভাষণে জানিয়েছেন, গত তিন মাসেই ড্রোন ও রোবটগুলো ২২ হাজারেরও বেশি মিশনে অংশ নিয়েছে।

প্রতিটি মিশন মানেই একজন ইউক্রেনীয় যোদ্ধার জীবন রক্ষা পাওয়া। জেলেনস্কির মতে, যেখানে একজন সেনার যাওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে, সেখানে একটি রোবটকে পাঠানোই সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা রুসি-র বিশেষজ্ঞ রবার্ট টোলাস্টের মতে, এই পরিবর্তন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও রোবট দিয়ে এখনো পুরোপুরি অঞ্চল দখল বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় কিন্তু উদ্ধার কাজ এবং বিপজ্জনক রসদ সরবরাহে এগুলো এখন অপরিহার্য।

ইউক্রেনের এই ড্রোন শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছেন বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাইখাইলো ফেডোরভ। এর আগে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন মন্ত্রী হিসেবে তিনি ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত যুদ্ধের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন নতুন ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা’ অনুযায়ী, রাশিয়াকে শান্তির পথে বাধ্য করতে ডেটা এবং উন্নত প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সীমান্তের ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি করা, যেখানে ড্রোন এবং রোবটগুলো বিরতিহীনভাবে পাহারা দেবে এবং যে কোনো আক্রমণ প্রতিহত করবে।

ইউক্রেনের এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যারা কোটি কোটি ডলার খরচ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তারা এখন ইউক্রেনের সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। জেলেনস্কি ইতিমধ্যে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো সফর করেছেন।

ইউক্রেন তাদের অর্জিত যুদ্ধকৌশল এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করার বিনিময়ে এসব দেশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই প্রযুক্তি বিনিময় যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে ইউক্রেন কাজ শুরু করলেও কমান্ডারেরা এখনো কিছুটা সতর্ক।

জিনকেভিচের মতে, রোবট বা এআই কখনোই মানুষের বিচারবুদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সব সময় একজন মানুষের হাতেই থাকা উচিত, যাতে বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে পার্থক্য করতে কোনো ভুল না হয়। তবে একজন সাবেক পদাতিক সৈনিক হিসেবে জিনকেভিচ এই বিবর্তনে ভীষণ আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন, যেহেতু রোবটের কোনো রক্ত নেই এবং তাদের মৃত্যুতে কোনো শোক নেই, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রদানবদের ব্যবহারই আধুনিক পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে মানবিক সমাধান।