পশ্চিম তীরে একের পর এক সহিংসতা, রেহাই পেল না মৃত ফিলিস্তিনির কবরও
সংগৃহীত ছবি
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এতে একাধিক বাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এক ফিলিস্তিনি শিশুকেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, শুক্রবার হেবরনের দক্ষিণে খিরবেত শুয়েইকা গ্রামে এক ব্যক্তি ও তার সন্তানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়। মাথায় আঘাতের কারণে বাবা ও শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেনিনের আল-আসা’আসা গ্রামে, ইসরায়েলি বাহিনী বাসিন্দাদের সদ্য কবর দেওয়া একটি মৃতদেহ খুঁড়ে তুলে অন্যত্র নিয়ে যেতে বাধ্য করে। তাদের দাবি, প্রথম স্থানটি একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির খুব কাছে ছিল।
নাবলুসের দক্ষিণে আল-লুব্বান আশারকিয়া গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, এরপর ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভাতে পৌঁছায়। রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আবু ফালাহতে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের উপকণ্ঠে হামলা চালায়।
একজন নাগরিকের গাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাড়ির দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে দেওয়া হয়।
ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বেথলেহেমের দক্ষিণে বেইত ফাজ্জার শহরেও একজন ফিলিস্তিনি ব্যক্তিকে আক্রমণ করে এবং তার মোবাইল ফোন চুরি করে। বেথলেহেমের দক্ষিণে বুরাক সুলায়মান (সোলোমনের পুল) এলাকায় একদল ফিলিস্তিনি বনভোজন করছিলেন, কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ওপর স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে তারা সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন।
এই হামলার পর ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কাঁদানে গ্যাস শ্বাস নেওয়ার কারণে অসুস্থ দুইজনের চিকিৎসা করে এবং আরো পাঁচজনকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
বেথলেহেমের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তুকু শহরের মেয়র তাইসির আবু মুফরেহ ওয়াফাকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী একটি স্থানীয় মসজিদ থেকে বের হয়ে আসা একদল মুসল্লির ওপর কাঁদানে গ্যাস ও শব্দ বোমা নিক্ষেপ করে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ভেতরে আটকে রাখা হয়।
শুক্রবার ইসরায়েলি বাহিনী বেথলেহেমের পশ্চিমে বাত্তির শহরে একটি রেললাইনের কাছে হাইকিং করার সময় চারজন ফিলিস্তিনি পুরুষকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন, নাবলুস শহরে চালানো এক অভিযানে আরো তিনজন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বসতি স্থাপনকারীরা রামাল্লার উত্তর-পূর্বে সিলওয়াদ শহরে হামলা চালায়, যার ফলে বাসিন্দারা তাদের বাধা দিলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় বসতি স্থাপনকারীদের সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিশাল এলাকাকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে দাবি করার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোতে ৭ লাখের বেশি ইসরায়েলি বাস করে।
এদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন বেসামরিক প্রতিরক্ষা উদ্ধারকর্মীসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গতকাল শুক্রবার টায়ার জেলার তোরা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুই নারীসহ চারজন নিহত এবং আরো আটজন আহত হয়েছেন। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ এক কিশোরীর সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে।
সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মারজায়ুন জেলার ব্লাত শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর লেবাননের রেড ক্রস দল নিখোঁজ দুই যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। এনএনএ-এর তথ্যমতে, শুক্রবার নাবাতিয়েহ, বিন্ট জেবেইল এবং সিডনসহ অন্যান্য জেলাতেও হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাসবায়া জেলার কাফারচুবা ও কাফারহামামকে সংযোগকারী সড়কে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি ড্রোন একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে একজন বেসামরিক প্রতিরক্ষা সদস্য নিহত হন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননের জন্য নতুন করে জোরপূর্বক এলাকা ছাড়ার নির্দেশ জারি করায় নমাইরিয়েহ, তাইর ফেলসাই, হাল্লুসিয়েহ, আপার হাল্লুসিয়েহ, তোরা এবং মারাকেহ শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে।
১৭ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে, কারণ ইসরায়েল সীমান্ত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর ছোড়া একটি ড্রোন হামলায় দুই সৈন্য আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে থাকা দক্ষিণ লেবাননের একটি এলাকায় আরেকটি ড্রোন হামলায় একজন সেনা আহত হয়েছেন।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক হামলা চালিয়েছে। হিজবুল্লাহর ভাষ্যমতে, তথাকথিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং দেইর সিরিয়ান শহরে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি ও আদশিত আল-কুসায়র যাওয়ার সড়কে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
টায়ার থেকে আল জাজিরার ওবাইদা হিত্তো জানিয়েছেন, গত ১২ ঘণ্টায় সামরিক তৎপরতা আরো তীব্র হয়েছে। প্রতিবেদক বলেন, ‘আমরা সারাদিন ধরে উপকূল বরাবর বিমান হামলা ও গোলন্দাজ হামলা দেখেছি।
গত কয়েক দিনের তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।’ লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দুই হাজার ৭৫৯ জন নিহত এবং আট হাজার ৫১২ জন আহত হয়েছেন।