ভারতে ‘তেলাপোকা পার্টির’ পর এবার আত্মপ্রকাশ করল ‘পরজীবী ফ্রন্ট’

ভারতে ‘তেলাপোকা পার্টির’ পর এবার আত্মপ্রকাশ করল ‘পরজীবী ফ্রন্ট’

ছবিঃ সংগৃহীত।

প্রতিপক্ষ খুঁজে পেল ভারতের তরুণদের অনলাইন গ্রুপ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।আরশোলাদের দলের বিপক্ষে উঠে এসেছে পরজীবীদের দল। নাম, ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ ওরফে এনপিএফ।

যে দেশ ইতমধ্যেই বিবিধ জোট, দল, উপদল এবং হোয়াট্‌সঅ্যাপ ওয়ার রুমে পরিপূর্ণ, সে দেশ হয়তো এ যাবৎকালের সবচেয়ে (জীব)বৈচিত্র্যপূর্ণ ‘রাজনৈতিক’ যুগে প্রবেশ করেছে।

সিজেপি এবং এনপিএফ— উভয়ই ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া দু’টি গোষ্ঠী, যারা লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের মতো গাম্ভীর্য এবং মিমের মতো মজার বিষয় নিয়ে নেটমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, দু’টি দলই তৈরি হয়েছে মূলত সমাজের জেন জ়িদের নিয়ে।

সিজেপি এবং এনপিএফ, দু’দলই নিজেদের ব্যঙ্গাত্মক বলে বর্ণনা করে। কিন্তু দুর্দান্ত সব রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মতো, তাদের রসিকতাগুলোও সফল হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে প্রতিবাদের রসদও জোগাচ্ছে।

এর সূত্রপাত বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশ ‘আরশোলার মতো’ আচরণ করেন বলে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করার পর। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মতে, ওই তরুণ-তরুণীরা কোনও পেশায় স্থান না পেয়ে সাংবাদিক, সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী বা তথ্যের অধিকার কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন ও সকলকে আক্রমণ করেন।

এক আইনজীবীর ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ তকমা নিয়ে মামলায় ওই মন্তব্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। যদিও প্রধান বিচারপতি পরে স্পষ্ট করেন যে, তার মন্তব্য ভুল ভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং বেকার যুবসমাজের সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে তিনি ওই মন্তব্য করেননি।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, তিনি বিশেষ ভাবে সেই সব মানুষের কথা বলেছিলেন যারা জাল বা ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে কোনও পেশায় প্রবেশ করেন। তিনি যুবকদের অবমাননা করেছেন বলে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।

কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ‘আরশোলা’ মন্তব্যের পর অনলাইনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশ সংগঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির। তারা একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে নেটমাধ্যমে। শুরু হয় নেটমাধ্যমে দলের সদস্য সংগ্রহের কাজও।

সিজেপি নিজেদের ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসাবে বর্ণনা করে, যার সদর দফতর ‘যেখানেই ওয়াইফাই কাজ করে’ সেখানেই অবস্থিত। এর আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটটি অন্য রাজনৈতিক ওয়েবসাইটের মতো নয়। মজা করে বানানো হয়েছে সেটি।

সিজেপির সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ‘যোগ্যতা’র মানদণ্ডও রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, বেকার, অলস, সারা ক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগত ক্ষেত্রে ক্ষোভ প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকলে তবেই এই দলের সদস্য হওয়া যাবে। চালু হওয়ার প্রথম দু’দিনের মধ্যেই ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্য সিজেপিতে নাম নথিভুক্ত করান। এর পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সিজেপির সদস্য এবং ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজ়াদ সিজেপির সদস্যপদ ‘গ্রহণ’ করেছেন। দলে ‘যোগ’ দিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, বলিউডের অনুরাগ কশ্যপ এবং কঙ্কনা সেনশর্মার মতো ব্যক্তিত্বও। দলটি একটি ভার্চুয়াল ‘জেন জ়ি’ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করার কথা ঘোষণা করেছে এবং এটি আয়োজনে সাহায্য করার জন্য তরুণ সমাজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন সিজেপির মুখ বা নেতা কে?

ব্যঙ্গাত্মক ওই রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রে রয়েছেন অভিজিৎ দীপকে নামের এক যুবক। তাঁর হাত ধরেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্ম। এক সপ্তাহ আগেও বস্টনে চাকরির জন্য আবেদন করছিলেন দিল্লির অরবিন্দ কেজরীওয়ালের দল আম আদমি পার্টির প্রাক্তন সমাজমাধ্যম কর্মী অভিজিৎ।

সপ্তাহখানেক আগে ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘আরশোলা’ মন্তব্যের পর যখন বিষয়টি নিয়ে অনলাইনে ক্ষোভের জন্ম হয়, তখন অভিজিৎ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ চালু করেন। তার আন্দোলন সমাজমাধ্যম ঝড় তোলে। কিন্তু এই অভিজিৎ কে? ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ কী?

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ এক জন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ, যার কাজের মূল বিষয় হল রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি, জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রদান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি কী ভাবে রাজনৈতিক মতামতকে প্রভাবিত করে তা দেখা।

পুণে থেকে সাংবাদিকতা নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন অভিজিৎ। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা চলে যান। তিনি বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যম দলে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবেও কাজ করেছেন অভিজিৎ।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের নেতৃত্বাধীন আম আদমি পার্টির দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের সময়, অভিজিৎ দলের হয়ে মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রচার চালানোর কাজ করেন, যা সে সময় দিল্লির যুবসমাজকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করা হয়।

অভিজিৎ ব্যাখ্যা করেছেন, দেশের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটি নিয়ে অনলাইনে বিতর্ক শুরু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সিজেপি খোলার পরিকল্পনা তার মাথায় আসে। তিনি সমাজমাধ্যমে মজা করে পোস্ট করেছিলেন, “যদি সব আরশোলা একজোট হয়?” আর এর পরেই তার পরিকল্পনা একটি পুরোদস্তুর ইন্টারনেট আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ দলে দলে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

বর্তমানে আমেরিকায় রয়েছেন অভিজিৎ। সেখান থেকেই চালাচ্ছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

ইনস্টাগ্রামে সিজেপি দলের ফলোয়ারের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে এক কোটির কাছাকাছি। ছাপিয়ে গিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সরকারি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলের ফলোয়ারের সংখ্যাকেও। কিছু দিন আগে শুরু হওয়া ভাইরাল ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া সিজেপি দলের বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা ৯০ লক্ষের বেশি।

২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-সহ ভারতের বেশির ভাগ মূলধারার রাজনৈতিক দলের চেয়েও ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা বেশি তাদের। তবে ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছোতেই এক্স হ্যান্ডলে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির অ্যাকাউন্ট।

ভারতে রাজনৈতিক শূন্যতা বেশি দিন থাকে না। আর তাই, প্রায় অনিবার্য ভাবেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি তৈরির পরে পরেই তৈরি হয়ে গিয়েছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ।

সিজেপি যেখানে ‘অলস এবং বেকার’দের প্রতিনিধিত্ব করছে, সেখানে এনপিএফ খুঁজছে প্রতিবাদীদের, যারা সমাজব্যবস্থার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে পারবে। দাবি, এনপিএফ গুরুতর রাজনৈতিক সংগঠনগুলির ‘সুর’কেই অনুকরণ করেছে। জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনের আদলে গড়া এই ফ্রন্টটি অতিরঞ্জিত বিপ্লবী ভাষা, ব্যঙ্গ এবং বিদ্রূপের ওপর ব্যাপক ভাবে নির্ভর করে তৈরি হয়েছে।

এনপিএফের বার্তায় ‘পরজীবী’দের একটি ভাঙা ব্যবস্থার মধ্যে টিকে থাকা নাগরিক হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা অভিজাত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের প্রতি একটি শ্লেষাত্মক জবাব। তবে সিজেপি-র মতো, এনপিএফও বেকারত্ব, রাজনৈতিক সুবিধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভকে প্রকাশ করতে ব্যঙ্গকেই হাতিয়ার করেছে।

নিজেদের আনুষ্ঠানিক ভাবে বর্ণনা করে এনপিএফ বলেছে, “সিজেপির বিরোধী দল হিসাবে জন্ম নেওয়া এনপিএফ হল এমন একদল নাগরিকের আন্দোলন, যাঁরা শাসনব্যবস্থাকে নাটক হিসাবে মেনে নিতে নারাজ। আমরা অপরাধমুক্ত সংসদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছি। শিক্ষিত প্রতিনিধিদের ব্যাপারেও আমরা সত্যিকারের চিন্তাভাবনা করছি।’’

এনপিএফের ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়েছে যে নামটি ইচ্ছাকৃত ভাবে দেওয়া। সেখানে লেখা হয়েছে, “আমরা একটি ভাঙা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তবে এর থেকে ফয়দা তোলার জন্য নয়, বরং ভেতর থেকে একে পরিবর্তন করতে তৈরি আমরা।”

ভারতীয় রাজনীতি চলে ইশেতেহারের উপর ভিত্তি করে। সিজেপি এবং এনপিএফ— উভয় দলই তা পরিষ্কার ভাবে বুঝেছে। নিজস্ব ‘নির্বাচনী ইস্তাহার’ও রয়েছে সিজেপির। সেই ইস্তাহার অনুযায়ী দলটি নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস’ বলে বর্ণনা করেছে। বেশ কিছু দাবিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইশতেহারে। যেমন— প্রধান বিচারপতিদের জন্য অবসর-পরবর্তী রাজ্যসভার আসনে নিষেধাজ্ঞা, সংসদের সদস্যসংখ্যা না বাড়িয়েই নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ এবং দলত্যাগী বিধায়ক এবং সাংসদদের জন্য ২০ বছরের নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা।

দলটি ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)’-কে পুনঃনিরীক্ষার ফি বাতিল করারও দাবি জানিয়েছে। বিষয়টিকে ‘প্রকাশ্য দুর্নীতি’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থনও জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, এনপিএফের ইস্তাহার আরও বেশি নাটকীয় পথ অবলম্বন করে। এনপিএফ ‘পরজীবী’দের এমন এক টিকে থাকা সত্তা হিসাবে তুলে ধরেছে, যারা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে পথ চলে যা সাধারণ নাগরিকদের শোষণ করে এবং ক্ষমতাশালীদের পুরস্কৃত করে।

এই দু’টি দলের মধ্যে পার্থক্যটি মূলত আদর্শগত। সিজেপি নিজেদের সেই স্থিতিস্থাপক নিম্নবর্গ হিসাবে তুলে ধরে, যারা অবিরাম অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সত্ত্বেও মরতে অস্বীকার করে— ঠিক যেমন আরশোলা করে। অন্য দিকে, এনপিএফ ব্যঙ্গাত্মক ভাবে সমাজব্যবস্থার দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছে। সমাজে ‘আসল পরজীবী’ কারা? সে প্রশ্নও তুলেছে দলটি।

একসঙ্গে উভয়েরই ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির প্রায় প্রতিটি দিককেই ব্যঙ্গ করেছে। আপাতত, আরশোলা বা পরজীবী দল— কোনওটিই ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছে স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়। তবে তাদের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন সমাজের বিভিন্ন স্তরের নজর কেড়েছে। তৈরির এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল সাফল্য অর্জন করেছে দল দু’টি— একই সঙ্গে মানুষকে হাসানো এবং ভাবানো।