কুরবানির চামড়ার টাকা কি মসজিদের কাজে খরচ করা যাবে?

কুরবানির চামড়ার টাকা কি মসজিদের কাজে খরচ করা যাবে?

সংগৃহীত ছবি

ঈদুল আজহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরবানির পশুর চামড়ার সঠিক ব্যবহার। প্রতি বছর কুরবানির মৌসুমে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— কুরবানির চামড়া বিক্রি করে তার অর্থ কি মসজিদে দান করা যাবে? কিংবা মসজিদ নির্মাণ ও পরিচালনার কাজে ব্যয় করা যাবে কি?

এ বিষয়ে শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কুরবানির পশুর চামড়া, গোশত কিংবা অন্যান্য অংশের ব্যবহার সম্পর্কে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়। তাই কুরবানির ইবাদতকে পরিপূর্ণ ও সহিহভাবে আদায় করার জন্য এসব মাসআলা জানা জরুরি।

কুরবানির চামড়ার মূল্য কি মসজিদে দান করা যাবে?

কুরবানির পশুর গোশত, চামড়া, হাড়, চর্বিসহ কোনো অংশ যদি কুরবানি দাতা নিজে ব্যবহার না করেন, কাউকে হাদিয়া না দেন কিংবা দান করার মতো উপযুক্ত কাউকে না পান, তাহলে তা বিক্রি করা যেতে পারে। তবে এ বিক্রয় শুধুমাত্র সদকার নিয়তে হতে হবে।

চামড়া বা কুরবানির পশুর অন্য কোনো অংশ বিক্রি করার পর সেই অর্থ নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা বৈধ নয়। একইভাবে কোনো সম্পদশালী ব্যক্তিকে তা উপহার দেওয়া কিংবা মসজিদে দান করাও জায়েজ নয়।

অতএব, কুরবানির চামড়ার মূল্য মসজিদে দান করা নাজায়েজ। এমনকি মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার বা পরিচালনার কাজে এই অর্থ ব্যয় করাও শরিয়তসম্মত নয়। বরং বিক্রয়লব্ধ অর্থ এমন দরিদ্র ব্যক্তিকে দিতে হবে, যে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত। এ বিষয়ে হাদিসে দিকনির্দেশনা এসেছে—

হজরত আলী (রা.) বলেন—

أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ، وَأَنْ أَتَصَدَّقَ بِلَحْمِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلَّتِهَا، وَأَنْ لَا أُعْطِيَ الْجَزَّارَ مِنْهَا شَيْئًا

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তার কুরবানির উটগুলোর তত্ত্বাবধান করতে নির্দেশ দেন এবং সেগুলোর গোশত, চামড়া ও চামড়ার ওপরের আবরণ সদকা করে দিতে বলেন। আর কসাইকে এর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে নিষেধ করেন।’ (বুখারি ১৭১৭, মুসলিম ১৩১৭)

এই হাদিস থেকে ফকিহগণ প্রমাণ গ্রহণ করেছেন যে, কুরবানির পশুর চামড়া ও তার মূল্য ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না; বরং তা সদকার খাতে ব্যয় করতে হবে।

যেসব খাতের অর্থ মসজিদে খরচ করা যাবে না

> জাকাতের অর্থ মসজিদ নির্মাণে ব্যয় করা যায় না।

> সদকাতুল ফিতর (ফিতরা) মসজিদে দেওয়া যায় না।

> মানতের অর্থও মসজিদ পরিচালনার কাজে ব্যয় করা যায় না।

> একইভাবে কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থও মসজিদে দেওয়া যাবে না।

কারণ এসব অর্থের নির্দিষ্ট শরয়ি খাত রয়েছে, যা সরাসরি উপযুক্ত দরিদ্র ব্যক্তির মালিকানায় পৌঁছানো আবশ্যক।

কোরবানির চামড়ার টাকা কি মাদরাসায় দেওয়া যাবে?

যেসব মাদরাসায় দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, আবাসন ও খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে কুরবানির চামড়ার অর্থ দেওয়া জায়েজ।

তবে শর্ত হলো— মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে সেই অর্থ জাকাতের উপযুক্ত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ অর্থের প্রকৃত মালিকানা শেষ পর্যন্ত ফকির-মিসকিন বা তাদের সমপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

কুরবানির পশুর চামড়া কি নিজে ব্যবহার করা যাবে?

যেভাবে কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া বৈধ, তেমনি কুরবানির পশুর চামড়াও নিজে ব্যবহার করা বৈধ। চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে জায়নামাজ, মশক, ব্যাগ, আসন কিংবা অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করে ব্যবহার করলে এতে কোনো অসুবিধা নেই। এতে কুরবানি শুদ্ধ থাকবে এবং কোনো গুনাহ হবে না।

কুরবানির পশুর চামড়া একটি মূল্যবান সম্পদ এবং শরিয়ত এর ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। চামড়া বিক্রি করা হলে তার অর্থ নিজের প্রয়োজনে, কোনো ধনী ব্যক্তিকে উপহার হিসেবে কিংবা মসজিদের কাজে ব্যয় করা বৈধ নয়। বরং তা জাকাতের উপযুক্ত দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।

অন্যদিকে, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত মাদরাসায় এ অর্থ দেওয়া যেতে পারে এবং চামড়া নিজেও ব্যবহার করা বৈধ। তাই কুরবানির ইবাদতকে পরিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য আমাদের উচিত চামড়ার ব্যবহার সম্পর্কিত শরিয়তের বিধানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরবানির বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত তাকওয়া ও আনুগত্যের শিক্ষা অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।