ঠাকুরগাঁওয়ে গৃহবধূর মৃত্যু, স্বামীসহ শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা
প্রতিকি ছবি
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকায় আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মিতু আক্তারের (২৫) মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বামীকে প্রধান আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রবিবার (৩১ মে) রাতে নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বাদী হয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলাটি করেন। মামলার আসামিরা হলেন- মিতুর স্বামী শাহিনুর রহমান (চান্দু), শ্বশুর মো. মুসলিম উদ্দীন এবং শাশুড়ি মোছা. সাহেরা খাতুন। তারা সবাই সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের আরাজি রামপুর গ্রামের দেবারু মোহাম্মদের মেয়ে মিতু আক্তারের সঙ্গে শাহিনুর রহমানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে মিতুর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো এবং তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দুই পরিবারের মধ্যে বৈঠক হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, শাহিনুর রহমান মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ঈদুল আজহার দিন নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ তার দুই নাতিকে নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। পরে এক নাতিকে সেখানে রেখে তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। দুই দিন পর সকালে শাহিনুরের ভাই শাহিদুল ইসলাম ফোন করে মিতুর মৃত্যুর খবর জানান। খবর পেয়ে তিনি মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথেই জানতে পারেন মরদেহ থানায় নেওয়া হচ্ছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিন মিতু বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে কিছু টাকা চাইলে শাহিনুর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করেন। এ সময় শ্বশুর ও শাশুড়িও যৌতুকের বিষয় নিয়ে গালিগালাজ ও নির্যাতনে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের নির্যাতন এবং ওই দিনের ঘটনার একপর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মিতু। আত্মহত্যার কথা বললে স্বামী তাকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে বিকেলে ঘরের মেঝেতে মিতুকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।
তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে পাঠান। তবে পরবর্তীতে তাকে মৃত অবস্থায় ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরিয়ে আনা হয়।
এদিকে মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার। তাদের অভিযোগ, রবিবার সকাল থেকে মরদেহ থানায় নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। পরে সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বলেন, আমার মেয়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আগামী জুন মাসেই তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে আমার মেয়ে ও অনাগত নাতিকেও হারালাম। যৌতুকের জন্য প্রায়ই তাকে মারধর করা হতো। বিয়ের পর থেকেই মেয়ের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছু সহ্য করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না।
তিনি আরও বলেন, মরদেহ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। তখন বুক ফেটে কান্না এসেছে। যে মেয়েকে এত আদর-যত্ন করে বড় করেছি, তাকে এভাবে হারাতে হবে কখনও ভাবিনি। শুধু আমার মেয়েই নয়, তার গর্ভের নিষ্পাপ সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, মরদেহটি রবিবার সকালেই থানায় আনা হয়েছিল। ময়নাতদন্ত সম্পন্নের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে কিছু কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত কারণে ময়নাতদন্তে বিলম্ব হয়েছে। সম্ভবত ডোম বা দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে এবং দ্রুততম সময়ে ময়নাতদন্ত সম্পন্নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া মামলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।