অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ, বৈধের চেয়ে অবৈধের সংখ্যা বেশি

অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ, বৈধের চেয়ে অবৈধের সংখ্যা বেশি

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং এখন বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে। অনুমোদিত ক্রসিংয়ের তুলনায় অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জনবল সংকট ও তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক বৈধ লেভেল ক্রসিংয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৩ হাজার ১০৪টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশই অনুমোদনহীন। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মোট ১ হাজার ৪৮৮টি ক্রসিং রয়েছে। এসবের মধ্যে অনুমোদিত ৭২৯টি এবং অনুমোদনহীন ৭৫৯টি।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ রেলক্রসিং রয়েছে পূর্বাঞ্চলে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেললাইনের পাশে ভূমি উন্নয়ন ও স্থানীয় যোগাযোগের অজুহাতে প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে এসব ক্রসিং তৈরি করেছে। অতীতে রেল প্রশাসন কাঠ বা পুরোনো রেললাইন দিয়ে এসব পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় বাধার কারণে তা সফল হয়নি।

জানা গেছে, বৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৬ হাজার গেটকিপার প্রয়োজন। ক্রসিংগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণির ক্রসিং জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানে ২৪ ঘণ্টা গেটকিপার নিয়োজিত থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে রেলওয়েতে বর্তমানে স্থায়ী গেটকিপার রয়েছেন মাত্র দেড় হাজারের মতো। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় দেড় হাজার অস্থায়ী কর্মী দায়িত্ব পালন করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। শুধু বৈধ ক্রসিংগুলো পরিচালনার জন্যই পাঁচ হাজারের বেশি জনবল প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক বৈধ ক্রসিংয়েও গেটম্যানরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না। বদলি দিয়ে অন্য কাজে নিয়োজিত থাকায় অনেক সময় গেট খোলা অবস্থায় থাকে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সবুক্তগীন বলেন, সড়ক পার হওয়ার সময় মানুষ দুই পাশে তাকিয়ে চলে, কিন্তু ট্রেন হঠাৎ করে থামানো সম্ভব নয়। তাই রেললাইন পারাপারের ক্ষেত্রে চালক ও পথচারীদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

তিনি বলেন, রেললাইনের ওপর সব সময় এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। অনুমোদনহীন স্থানে পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা গেটগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা করছি। গেটম্যানদের রাতের ডিউটি নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন।

মহাব্যবস্থাপক আরও বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে অনুমোদনহীন ক্রসিংগুলোতে, যেখানে কোনো গেটম্যান থাকে না। এসব স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অনেকেই তা উপেক্ষা করেন। দুর্ঘটনা এড়াতে চালক ও পথচারীদের সচেতনতার বিকল্প নেই।

সর্বশেষ গত ৭ জুন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সোনাপাহাড় এলাকায় সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষ হয়। এতে কেউ হতাহত না হলেও প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পিকআপটি একটি অবৈধ রেলক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে।

দুর্ঘটনার পর রেলওয়ের ফেনী এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব শীল বলেন, ওই অবৈধ ক্রসিং দিয়ে পারাপারের সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে সেখানে অবৈধ পারাপার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।