বেগুনি আলুর বিশ্বজয়, চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা
ছবিঃ সংগৃহীত।
লন্ডনের জনপ্রিয় ফিলিপাইনি রেস্তোরাঁ ‘কাসা অ্যান্ড কিন’-এ গেলেই চোখে পড়বে ‘উবে সুনামি চিজকেক’, যার ওপর চকচক করছে গাঢ় বেগুনি রঙের গ্লেজ।মিষ্টিপ্রেমীরা সেখানে ভিড় করছেন উবে ব্রাউনি, উবে আইসক্রিম, উবে ম্যাকারন কিংবা উবে মার্গারিটার স্বাদ নিতে। একসময় এই রেস্তোরাঁয় মূলত ফিলিপাইনি প্রবাসীরাই আসতেন দেশি খাবারের স্বাদের খোঁজে। তবে এখন চিত্রটা ভিন্ন। শুধু এই আকর্ষণীয় বেগুনি রঙের পেস্ট্রির ছবি তুলতে আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতেই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভোজনরসিকরা।
ফিলিপাইনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত সাধারণ এক ধরনের মিষ্টি আলু বা ‘উবে’ (Ube) এখন পশ্চিমা বিশ্বের মেন্যুতে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। গত এক বছরে স্টারবাকস, কস্টা কফি এবং প্রিট এ ম্যানেজারের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে তাদের মেন্যুতে উবে-মিশ্রিত বিভিন্ন ড্রিংকস বা পানীয় যুক্ত করেছে। এর মৃদু, মাটির মতো সোঁদা এবং বাদামের মতো হালকা চনমনে স্বাদ মানুষকে দারুণভাবে আকর্ষণ করছে। তবে এর চেয়েও বড় কারণ—এর চমৎকার ও নজরকাড়া বেগুনি রঙ, যা ইন্টারনেট দুনিয়ায় এই সাধারণ আলুকে রাতারাতি এক সেনসেশনে পরিণত করেছে।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে ‘ডায়োস্কোরিয়া অ্যালাটা’ (Dioscorea alata) নামে পরিচিত এই উবের এমন বেগুনি রঙের পেছনে রয়েছে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ নামে এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এর ফলে এটিকে এখন এক প্রকার ‘সুপারফুড’ হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে।
ম্যানিলার খাদ্য গবেষক ইগে রামোস জানান, ফিলিপাইনে প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল বা ভাত জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগে থেকেই উবে ছিল শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের প্রধান উৎস। ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর এটি মিষ্টান্ন বা ‘হালায়া’ (স্প্যানিশ শব্দ হ্যালিয়া বা জেলি থেকে এসেছে) হিসেবে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ১৮০০ শতকের শেষের দিকে মার্কিন শাসনের সময় এই জ্যামে কনডেন্সড মিল্ক যোগ করে এর স্বাদ আরও বাড়ানো হয়। ফিলিপাইনিদের কাছে এই মিষ্টি ও ক্রিমি স্বাদের ‘হালায়া’ সংস্করণটিই আসল উবে হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বজুড়ে এই অভূতপূর্ব চাহিদার কারণে ফিলিপাইনের উবে চাষিরা এখন হিমশিম খাচ্ছেন। এর লতাগুলো পরিপক্ব হতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগে এবং বছরে মাত্র একবারই ফলন পাওয়া যায়। তার ওপর ফিলিপাইনের নিয়মিত বন্যা ও ঝড়-তুফানের কারণে প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়ে যায়। মূলত ছোট ছোট জমিতে সনাতন পদ্ধতিতে এর চাষ হয়।
বর্তমানে ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছ থেকেও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন ফিলিপাইনের চাষিরা। একই সঙ্গে বাজারে উবের নামে নকল পণ্যের ছড়াছড়িও বাড়ছে। ইংল্যান্ডপ্রবাসী ফিলিপাইনি কাইল রাসেল জানান, তিনি একবার একটি ‘উবে ককটেল’ অর্ডার করে দেখেন যে তাতে আসল উবের বদলে মিষ্টি আলুর পাউডার ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ট্রেন্ডের সুযোগ নিয়ে মানুষ এখন স্রেফ টাকা কামানোর জন্য নকল জিনিস তৈরি করছে।
বিশ্বজুড়ে চাহিদা বাড়লেও এর বীজ বা চারা তৈরির উপাদানের তীব্র সংকট রয়েছে। একটি উবে কন্দ কেটে কয়েক টুকরো করে নতুন গাছ রোপণ করতে হয়, যার ফলে এক কেজি কন্দ থেকে মাত্র অল্প কয়েকটি চারা পাওয়া সম্ভব।
তবে চাষিদের আশার আলো দেখাচ্ছে ফিলিপাইন সরকার। একটি কন্দ থেকে কীভাবে আরও বেশি চারা উৎপাদন করা যায়, তা নিয়ে গবেষণায় অর্থায়ন করছে তারা।
ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের কৃষক রোজেল জুয়ান ইন্টারনেটে উবের এই তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে গত এপ্রিলে এর চাষ শুরু করেন। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও যে উবে প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৫০ পেসোতে বিক্রি হতো, এখন তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ পেসো (প্রায় তিন মার্কিন ডলার)। রোজেল জুয়ানের ভাষায়, এটি আমাদের কাছে খুবই সাধারণ একটি গাছ ছিল, কিন্তু এখন এটি যেন আস্ত সোনা।