বগুড়ায় বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা, চার বছরে প্রাণ গেছে দেড় হাজারের বেশি
প্রতিকি ছবি
বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জেলায় চার বছরে ১ হাজার ৬৩৪টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। যার পেছনে মূলত কাজ করছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের জের, সংসারে অভাব-অনটন, পরকীয়া প্রেম, যুবক-যবতীদের পছন্দমত বিয়ে না দেওয়া, সাইবার বুলিং, হতাশা, নারী শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ, কাঙ্খিত মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়া, ঋণের চাপ এবং পরিবারের সাথে অভিমান।
আত্মহননকারীদের প্রায় অর্ধেকই নারী এবং তরুণ প্রজন্মের।
যাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া কয়েকজন কিশোরীও রয়েছে এই তালিকায় যাদের বয়স ১৩ থেকে আঠার বছর বয়সের মধ্যে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত জেলায় ১১৬ জন আত্মহত্যা করেছে।
এদিকে আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজগুলোতে পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সচেতনতামূলক ও কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা অপ্রতুল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ
স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের জের ধরে অভিমানে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাদের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা থাকে না। সংসারে অভাব-অনটন, চাওয়া-পাওয়ার সংমিশ্রণ না ঘটলে এবং পরকীয়ার কারণেও অনেক নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। কাঙ্খিত কোন কিছু না পেলেই তাদের মধ্যে নিজেকে শেষ করে দেয়ার ইচ্ছা কাজ করে।
আর সেই ইচ্ছা থেকেই তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। পাশাপাশি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ, সাইবার বুলিং এবং প্রেমে ব্যর্থতা এই প্রবণতার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। হাসি-খুশি আড্ডার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য একাকীত্ব। চোখে আনন্দ ঝলকালেও বুকের ভেতরে জমে থাকে পাহাড়সম চাপ। হতাশা-বিষন্নতাসহ নানা কারণে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
আবার ঋণের বোঝা সইতে না পেরে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছেন। অনেক সন্তান তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে কাঙ্খিত মোবাইল ফোন এবং মোটরসাইকেল না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় (ইমো, ম্যাসেঞ্জার) ছবি বা ভিডিও কলে ব্যক্তিগত মুহূর্তের তথ্য ফাঁস ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক নারী শিক্ষার্থী মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার করছেন। এসব আত্মহত্যার মত ঘটনাগুলোকে কমিয়ে আনতে হলে ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজকেও অনেক ভূমিকা পালন করতে হবে।
বগুড়া জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত জেলায় ১১৬ জন আত্মহত্যা করেছে। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৭ জন, মার্চ মাসে ২৯ জন, এপ্রিলে ২৪ জন ও মে মাসে ২০ জন আত্মহত্যা করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলায়। গত বছর ২০২৫ সালে জেলায় ৪১১ জন আত্মহত্যা করলেও ২০২৪ সালে জেলায় ৩৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন ও ২০২২ সালে ৩৮৫ জন আত্মহত্যা করে। সব মিলিয়ে ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট চার বছর ৫ মাসে বগুড়া জেলায় ১ হাজার ৬৩৪ জন আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যারা আত্মহত্যা করেন তার মধ্যে ২৫ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী।
বগুড়ার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, অনেক নারী শিক্ষার্থী হতাশার বিষয়টি অভিভাবকদের শেয়ার করতে পারেনা। অভিভাবকরাও এব্যাপারে তাদেরকে কাউন্সিলিং করেন না। এ নিয়ে মা-বাবার সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ে। বয়সন্ধিকালে বাচ্চাদেরকে স্বপ্ন দেখাতে হবে। কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক পথ সে বিষয়ে কাউন্সিলিং করাতে হবে। এখনকার বাচ্চারা খুবই স্পর্শকাতর। আদর স্নেহ দিয়ে তাদের ভুল ভেঙ্গে দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আত্মহত্যার কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের আত্মহত্যা না করতে সচেতন করে তুলতে পারে।
সিআইডি বগুড়ার পুলিশ সুপার মোঃ মোতাহার হোসেন জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, প্রেম, ভিডিও কলে প্রেমালাপ, আপত্তিকর ও অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি বিপদে ফেলছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে।