নিজের আগে অন্যের স্বার্থ, ইসলামের অনন্য নৈতিক শিক্ষা

নিজের আগে অন্যের স্বার্থ, ইসলামের অনন্য নৈতিক শিক্ষা

ফাইল ফটো

মানুষ স্বভাবতই নিজের প্রয়োজন, স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা আগে ভাবে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে এমন এক উচ্চতর নৈতিকতায় উন্নীত করেছে, যেখানে নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে মহান চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় এই মহৎ গুণকে বলা হয় ‘ইসার’ অর্থাৎ নিজের প্রয়োজনের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া।

এটি ঈমান, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রকাশ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসা গড়ে তুলতে এই গুণের গুরুত্ব অপরিসীম।

কোরআনের দৃষ্টিতে ইসার

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আনসার সাহাবিদের প্রশংসা করে বলেন- ‘তারা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর: ৯)

মুফাসসিরদের বর্ণনা অনুযায়ী, এই আয়াতের পেছনে এক চমৎকার ঘটনা রয়েছে। এক আনসারি দম্পতি নিজেরা না খেয়ে এবং সন্তানদের খাবার না খাওয়ায়ে, প্রদীপ নিভিয়ে অন্ধকারে খাওয়ার ভান করে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একজন ক্ষুধার্ত অতিথিকে পুরো খাবার খাইয়ে দেন। পরদিন রাসুলুল্লাহ (স.) জানান, আল্লাহ তাদের এই আত্মত্যাগে খুব সন্তুষ্ট হয়েছেন। এই ঘটনা সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এবং সুরা হাশরের এই আয়াতের অন্যতম প্রসিদ্ধ প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখিত।

ইসারের আরেকটি সরাসরি কোরআনি ভিত্তি পাওয়া যায় সুরা আলে ইমরানে যে, ‘তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় করো।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯২)

অর্থাৎ ইসলামে প্রকৃত পুণ্য অর্জনের পথ হলো নিজের প্রিয় বস্তু অন্যের জন্য ব্যয় করতে পারার মধ্যে।

ঈমানের পূর্ণতার শর্ত

অন্যের কল্যাণ কামনা করা ঈমানের দাবি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যও সেই কল্যাণ পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

অন্যের জন্য কাজ করলে আল্লাহও সাহায্য করেন

ইসলাম অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে আত্মত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; এটিকে আল্লাহর সাহায্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো- অন্যের উপকার করা নিজের ক্ষতি নয়; আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের একটি নিশ্চিত পথ।

একটি দেহের মতো সমাজ

মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত- রাসুলুল্লাহ(স.) অত্যন্ত সুন্দর একটি উপমার মাধ্যমে তা ব্যাখ্যা করেছেন-

‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে মুমিনদের উদাহরণ একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হয়, তখন পুরো দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১১; সহিহ মুসলিম)

অর্থাৎ অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করা ইসলামি সমাজব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

দৈনন্দিন জীবনে ইসারের চর্চা

অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রতিদিনের জীবনে চর্চা করা যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘একজনের খাবার দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ (সহিহ মুসলিম: ২০৫৯)

অল্প সম্পদ ভাগ করে নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, নিজের সুবিধার আগে অসহায় মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা করা এসবই ইসারের বাস্তব রূপ। তবে আলেমরা স্পষ্ট করেছেন, অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নিজের অপরিহার্য দায়িত্ব বা দ্বীনি কর্তব্য যেন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

আজকের প্রতিযোগিতামূলক ও আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে ইসলামের ইসারের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- প্রকৃত মর্যাদা কেবল নিজের জন্য অর্জনে নয়, অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেও নিহিত। যে ব্যক্তি মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখে, তার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ রয়েছে। তাই নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া একজন মুমিনের ঈমান, আখলাক ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।