চসিকের ইতিহাসে একক খাত থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়
ছবিঃ সংগৃহীত।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একক কোনো খাত থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের নজির স্থাপিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকার চেক গ্রহণ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
সোমবার দুপুরে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মেয়র এ তথ্য জানান এবং এই রাজস্ব নগর উন্নয়নের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
মেয়র বলেন, এটি শুধু একটি রাজস্ব আদায় নয়, বরং চট্টগ্রামবাসীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত কম হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন এবং আইন অনুযায়ী ন্যায্য কর আদায়ের উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন বন্দরের কাছ থেকে কোনো ধরনের কম্পেনসেশন চার্জ গ্রহণ করে না। অথচ বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টন ধারণক্ষমতার ভারী যানবাহন প্রতিনিয়ত চসিকের নির্মিত সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে প্রতিবছর শুধু সড়ক সংস্কারেই অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই বন্দরের কাছে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং আইনি ভিত্তিতে নির্ধারিত ন্যায্য হোল্ডিং ট্যাক্সই দাবি করা হয়েছে।
ডা. শাহাদাত জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুরোধে উভয় প্রতিষ্ঠানের তিনজন করে মোট ছয়জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সমন্বয়ে যৌথ মূল্যায়ন (জয়েন্ট অ্যাসেসমেন্ট) পরিচালিত হয়। এতে প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ বর্গফুট স্থাপনার মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। যৌথ মূল্যায়নে উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করায় এটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্দরের পক্ষ থেকে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা হলেও সিটি কর্পোরেশন আইনের বিধান অনুযায়ী আপিল গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ জমা দিতে হয়। সেই বিধান অনুসারেই আজ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকার চেক সিটি কর্পোরেশনকে প্রদান করা হয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সিটি কর্পোরেশন পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মেয়র বলেন, এই রাজস্ব নগরবাসীর কল্যাণেই ব্যয় করা হবে। সর্বপ্রথম ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা এবং শিক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নগরীর সড়ক উন্নয়ন, নতুন আরসিসি রাস্তা নির্মাণ, সড়কবাতি স্থাপন, কালভার্ট ও প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, মশকনিধনের কার্যক্রম জোরদার এবং উন্নতমানের ওষুধ ক্রয়সহ নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
দেওয়ানহাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ করিডোরকে আরসিসি সড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মেয়র। তিনি বলেন, প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরসিসি সড়ক এবং আরও ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় এই করিডোর আরসিসি সড়কে উন্নীত করা সময়ের দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে চসিকের মোট প্রায় ১৯৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের বকেয়া প্রায় ১৫৪ কোটি ৬৮ লাখ এবং চলতি অর্থবছরের দাবি প্রায় ৪২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ইতোমধ্যে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, চসিকের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করার কাজও এগিয়ে চলছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক হোল্ডিং ট্যাক্স ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, হোটেল, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ন্যায্য কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মেয়র বলেন, আবাসিক করদাতাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে আইনসম্মত সুযোগের মধ্যে কর ও সারচার্জে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবাইকে আইন অনুযায়ী ন্যায্য কর পরিশোধ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন কর ফাঁকি দিতে না পারে, সে বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন কঠোর অবস্থানে থাকবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে একটি স্বাবলম্বী ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ন্যায্য রাজস্ব আদায়ের বিকল্প নেই। এই অর্থ জনগণের কাছ থেকেই আসে এবং জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে। তাই প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
মেয়র এ ঐতিহাসিক রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই অর্জন চট্টগ্রামবাসীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা অভিষেক দাশ প্রমুখ।