গিবত আর হক কথা: ফারাকটা আসলে কোথায়?

গিবত আর হক কথা: ফারাকটা আসলে কোথায়?

ফাইল ফটো

ইসলামে সব সত্য কথা বলাই হক কথা নয়। যে সত্য কথা বলার শরয়ি প্রয়োজন আছে, তা হক কথা; আর যে সত্য কথা বলার কোনো বৈধ প্রয়োজন নেই, অথচ তা কারও সম্মানহানির কারণ হয়, সেটিই গিবত। এখানেই হক কথা ও গিবতের মৌলিক পার্থক্য।

বর্তমান সময়ে এই সীমারেখা নিয়ে বিভ্রান্তি ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়াজ-মাহফিল, টকশো কিংবা সাধারণ আড্ডায় প্রায়ই শোনা যায়- ‘আমি তো সত্য কথাই বলেছি।’ কিন্তু সত্য বললেই কি তা গিবত থেকে মুক্ত হয়ে যায়? আবার অন্যায়ের প্রতিবাদ বা দ্বীনের স্বার্থে কারও ভুল তুলে ধরলে সেটিও কি গিবত? এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে কোরআন, সুন্নাহ এবং ফকিহদের ব্যাখ্যা।

গিবত কী?

গিবত অর্থ পরনিন্দা, দোষচর্চা বা কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ উল্লেখ করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে। রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা কি জানো গিবত কী?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি যা বলছি, তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে?’ তিনি বললেন, ‘যদি তা তার মধ্যে থাকে, তাহলে তুমি তার গিবত করলে। আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯; আবু দাউদ: ৪৮৭৪; তিরমিজি: ১৯৩৪)

অর্থাৎ, সত্য হলেও অনুপস্থিত ব্যক্তির অপছন্দনীয় দোষ বলা গিবত। মিথ্যা হলে সেটি অপবাদ (বুহতান)।

ইমাম নববী (রহ.) তাঁর ‘রিয়াদুস সালেহিন’ ও ‘আল-আজকার’ গ্রন্থে বলেন, মানুষের শরীর, দ্বীন, চরিত্র, আচরণ, সম্পদ, পরিবার, পোশাক বা চলাফেরা সংক্রান্ত এমন কোনো দোষ উল্লেখ করা, যা সে অপছন্দ করে, সেটিই গিবত; তা মুখে, লেখায়, ইঙ্গিতে বা ইশারায় যেভাবেই হোক না কেন। বর্তমান যুগে ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, স্ক্রিনশট প্রকাশ, ব্যক্তিগত ইনবক্স ফাঁস, মিম বা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমেও গিবত সংঘটিত হতে পারে।

গিবত কেন এত ভয়ংকর?

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা হুজরাত: ১২) মানুষের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য উপমা দিয়ে কোরআন গিবতের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। হাদিসে আছে, আয়েশা (রা.) একবার সাফিয়্যা (রা.) সম্পর্কে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করলে রাসুল (স.) বলেন, ‘তুমি এমন একটি কথা বলেছ, যদি তা সমুদ্রে মিশিয়ে দেওয়া হতো, তবে সমুদ্রের পানিও পরিবর্তিত হয়ে যেত।’ (আবু দাউদ/তিরমিজি) মেরাজের রাতে রাসুল (স.) এমন লোকদের দেখেন, যারা তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছে। জিবরাইল (আ.) বলেন, ‘এরা সেই লোক, যারা মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ গিবত করত)।’ (আবু দাউদ: ৪৮৭৮)

তাহলে কি সব সমালোচনাই গিবত?

না। ইসলাম অন্যায়কে আড়াল করার শিক্ষা দেয় না, আবার অকারণে মানহানিরও অনুমতি দেয় না। আলেমরা গিবতের কয়েকটি বৈধ ব্যতিক্রম উল্লেখ করেছেন-

১. জুলুমের বিচার চাইতে। কেউ জুলুম করলে বিচার পাওয়ার জন্য অভিযোগ করা বৈধ। (সুরা নিসা: ১৪৮)

২. ক্ষতি থেকে সতর্ক করতে। প্রতারক বা ষড়যন্ত্রকারী সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা বৈধ। রাসুল (স.) এক ব্যক্তিকে দেখে আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘সে তার গোত্রের নিকৃষ্ট ব্যক্তি’ (তিরমিজি: ১৯৯৬) উদ্দেশ্য ছিল সতর্ক করা।

৩. দ্বীন রক্ষায় ভুলের খণ্ডন। কেউ প্রকাশ্যে ভুল আকিদা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করলে তা থেকে সতর্ক করা গিবত নয়; তবে শর্ত, উদ্দেশ্য দ্বীন রক্ষা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা গালিগালাজ নয়, কেবল দলিলসহ খণ্ডন। এ ক্ষেত্রে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে বক্তব্য বা মতবাদ; ব্যক্তির চরিত্রহনন নয়।

৪. প্রকাশ্য গুনাহ। যে নিজের গুনাহ গোপন রাখে না, তার প্রকাশ্য কাজের আলোচনা গিবত নয়; তবে তার গোপন দোষ বা পারিবারিক বিষয় প্রকাশ করা সম্পূর্ণ হারাম।

৫. পরিচয়ের প্রয়োজনে। উপনাম ছাড়া চেনানো সম্ভব না হলে কেবল পরিচয়ের উদ্দেশ্যে তা বলা যায়, অপমানের উদ্দেশ্যে নয়।

৬. ফতোয়া বা পরামর্শ নিতে। ‘আমার স্বামী এমন আচরণ করেন, কী করব?’- এ ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া গিবত নয়।

হক কথা কখন গিবতে পরিণত হয়?

‘আমি তো সত্যই বলছি’- এ যুক্তি ইসলামে যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো- কেন, কোথায়, কার কাছে এবং কী উদ্দেশ্যে বলছেন? উদ্দেশ্য যদি অপমান করা, ছোট করা, সম্মান নষ্ট করা, বিদ্বেষ ছড়ানো বা মানুষকে হাসানো হয়, তাহলে সত্য কথাও গিবতে পরিণত হতে পারে।

আলেমদের সুপরিচিত নীতি হলো- সংশোধনের উদ্দেশ্যে নসিহা সাধারণত গোপনে দেওয়াই উত্তম। তবে কেউ যখন প্রকাশ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায়, জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যক্তিগত নসিহায় সংশোধন হয় না, তখন দলিলসহ তার ভুল প্রকাশ করা বৈধ হতে পারে। উদ্দেশ্য হবে সংশোধন, অপমান নয়।

আধুনিক যুগের গিবত

ব্যক্তিগত স্ক্রিনশট প্রকাশ, গোপন ইনবক্স ফাঁস, অনুমতি ছাড়া অডিও-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যঙ্গাত্মক মিম বা বিদ্রূপাত্মক কনটেন্ট তৈরি- এসবও গিবতের নতুন রূপ। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কথা বলে চারদিকে তাকায় (অর্থাৎ গোপন রাখতে চায়), তখন তা আমানত’ (তিরমিজি)। অর্থাৎ কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা গিবত, চোগলখুরি বা আমানতের খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

গিবত করা যেমন হারাম, তেমনি গিবত শোনাও একই গুনাহ। আলেমদের মতে, গিবতকারী ও শ্রোতা উভয়েই এ গুনাহে অংশীদার, যদি শ্রোতা তা প্রতিহত না করে।

গিবত হয়ে গেলে কী করবেন?

আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করতে হবে; সম্ভব হলে যার গিবত করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আলেমরা বলেন, যদি ক্ষমা চাওয়ার ফলে আরও বড় ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অধিকহারে তার জন্য দোয়া, ইস্তেগফার এবং তার প্রশংসা করা- এসবের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করবে।

হক কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সতর্ক করা সবই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু অপ্রয়োজনে দোষচর্চা, সম্মানহানি বা ‘হক কথা’র নামে বিদ্বেষ ছড়ানো কখনো বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

তাই কোনো কথা বলার আগে একজন মুমিনের নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা উচিত- এটি কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এবং এটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলা হচ্ছে? এই তিনটি প্রশ্নের সৎ উত্তরই বলে দেবে- এটি হক কথা, নাকি গিবত।