কোর্তোয়ার চোটেই কি কপাল পুড়ল বেলজিয়ামের
সংগৃহীত ছবি
টাইম মেশিনে চেপে ৮ বছর আগের জুলাইয়ে ফেরা যাক। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে পিছিয়ে ব্রাজিল।
কাজানে ম্যাচের শেষ দিকে নেইমার জুনিয়র নিলেন বাঁকানো এক শট। বলটা ডান দিকের কোণ দিয়ে বেলজিয়ামের জালে প্রায় ঢুকেই যাচ্ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সুপারম্যানের মতো লাফিয়ে উঠে তা ঠেকিয়ে দিলেন থিবো কোর্তোয়া।
ব্যস, ব্রাজিলের সমতায় ফেরার সম্ভাবনা সেখানেই শেষ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল বেলজিয়াম।
৮ বছর পর আরেক জুলাইয়ে হয়তো আবারো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে পারত বেলজিয়াম।
লস অ্যাঞ্জেলেসে এবার হয়তো স্পেনের বিপক্ষে ‘সুপার হিরো’ বনে যেতে পারতেন কোর্তোয়া।
লামিনে ইয়ামালকে একাধিকবার হতাশ করার পর প্রায় ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ’ থেকে নেওয়া মিকেল ওইয়ারজাবালের শট রুখে আরেকটি বীরত্বগাথা জন্ম দেওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা গোলকিপার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারলে তো! আচমকা ঊরুর চোটে পড়ে মাঠে লুটিয়ে পড়লেন কোর্তোয়া। কিছুক্ষণ চিকিৎসা নেওয়ার পর উঠে দাঁড়ালে ধারণা করা হচ্ছিল, খেলা চালিয়ে যেতে পারবেন।
কিন্তু পারলেন না।
৭২ মিনিটে চোখের জলে মাঠ ছাড়লেন কোর্তোয়া। ৮ বছর আগে যার কারণে নেইমারের ব্রাজিলকে কাঁদতে হয়েছিল, আজ সেই মানুষটার দুচোখ বেয়ে জল পড়ল। জার্সি তুলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার চেষ্টা করেও কান্না আড়াল করতে পারলেন না!
কোর্তোয়া হয়তো তখনই বুঝে নিয়েছেন, ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের ১৮ মিনিট বাকি থাকতে তার মাঠ ছাড়ার পর দলকেও এই বিশ্বকাপের মোহ ছাড়তে হবে।
হলোও তা-ই। যাকে থিবো কোর্তোয়ার যোগ্য উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে, সেই সেনে লামেন্স কোর্তোয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বদলি নামলেও তার রেখে যাওয়া কাজটুকু করতে পারলেন না। বরং করলেন এক বড় ভুল।
পাউ কুবারসির নিচু শট ঝাঁপিয়ে আটকালেও বল হাতে রাখতে পারলেন না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের গোলকিপার লামেন্স। ছুটে এসে সেই বল জালে পাঠালেন স্পেনের ‘সুপার সাব’ মিকেল মেরিনো। লামেন্সের ভুলের চড়া মাশুল দিয়ে বিদায় নিতে হলো বেলজিয়ামকে। অথবা একটু ঘুরিয়ে বলতে পারেন, কোর্তোয়ার চোটে কপাল পুড়ল বেলজিয়ামের।
দ্য অ্যাথলেটিকও বলছে সেই কথা। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থিবো কোর্তোয়ার চোট স্পেনের বিপক্ষে বেলজিয়ামের হারে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রিয়াল মাদ্রিদের অভিজ্ঞ এই গোলকিপার একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে বেলজিয়ামকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন।
ঊরুর চোটে পড়ার পর কোর্তোয়া শুধু গোলকিক নিতে পারছিলেন না। বাকি কাজগুলো স্বাভাবিকভাবে করতে পারছিলেন। তাই খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া কোর্তোয়াকে আর খেলাতে চাননি। ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, ‘এটাই শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল। এমন ম্যাচে ভালো খেলতে হলে পুরোপুরি মনোযোগী থাকতে হয় এবং শতভাগ ফিট থাকতে হয়। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ১০০ শতাংশ ফিট নয়—এমন কোনো খেলোয়াড়কে মাঠে রাখব না। আজ কোর্তোয়ার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।’
গার্সিয়া আরো বলেন, ‘বিশ্বকাপজুড়ে কোর্তোয়া দুর্দান্ত খেলেছে। কিন্তু আমরা চাইনি তার চোট আরো গুরুতর হয়ে উঠুক। তাই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে।’
কোচের যুক্তি এক অর্থে হয়তো ঠিক, আবার আরেক অর্থে পুরোপুরি ঠিক নয়। দেশের প্রতি নিবেদন দেখিয়ে যে মানুষটা খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাকে আর ১৮ মিনিট কিংবা পুরো ম্যাচ খেলতে দিলে কী এমন হতো!
এবারের আসরে বিশ্বস্ত হাত দুটি দিয়ে মোট ১০টি সেভ করেছেন কোর্তোয়া। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার ২১তম ম্যাচ। গোলকিপারদের মধ্যে বিশ্বকাপে তার চেয়ে বেশি ম্যাচে খেলেছেন শুধু একজন—জার্মানির মানুয়েল নয়্যার; ২৩টি।
কোর্তোয়ার বয়স ৩৪ পেরিয়েছে। ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৮ বছর। ৪০ বছর বয়সেও কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, তা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে কোর্তোয়া পরের বিশ্বকাপ খেলতেই পারেন। নয়্যারকে ছাড়িয়ে তিনিই হয়ে যেতে পারেন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা গোলকিপার।
তবে তার আগে ভেঙে পড়া কোর্তোয়ার মনটা যে আবারো জোড়া লাগাতে হবে!