উপকূলজুড়ে বন্যার ভয়াবহতা, দুর্গম এলাকায় প্রয়োজন ত্রাণ
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাহারছড়া ইউনিয়নের বৃহত্তর গ্রাম ইলশা। এই গ্রামের হামিদ কাজির পাড়ার বাসিন্দা আবদুল করিম। একসময় কৃষিকাজ করলেও বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। আরও দুই ভাইয়ের পরিবার নিয়ে থাকতেন মাটির ঘরে। বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। শনিবার পানি কিছুটা কমলে বাড়ি গিয়ে দেখেন তাদের মাটির ঘরটি ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শুধু করিম নয়; এই গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম, সকিয়া ইয়াসমিনসহ অনেকের মাথা গোঁজার ঠাঁই বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে থাকতে থাকতে এই গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দার মাটির ঘরগুলো নুয়ে পড়েছে। কারো ঘরের পুরোটা মাটিতে মিশে গেছে, কারো ঘরের কিছু অংশ ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। ফলে পানি কমলেও বাড়ি থাকার সুযোগ নেই তাদের।
বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে বাহারছড়া ইউনিয়ন অন্যতম। উপকূলীয় এই ইউনিয়নের নয়টি গ্রামের মধ্যে পূর্ব ইলশা, পশ্চিম ইলশা, মধ্য ইলশা, উত্তর ইলশা, রত্নপুর, চাপাছড়িসহ প্রায় পুরো এলাকই পানির নিচে তলিয়ে ছিল টানা চারদিন। এখন তারা বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকটে পড়েছেন।
এই গ্রামে ত্রাণ সামগ্রী দিয়ে সহায়তাকারী স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহেদ এমরান শহীদ জানান, বৃহত্তর ইলশা গ্রামে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। এই গ্রাম ও আশপাশের গ্রামগুলোর যারা মাটির ঘরে বাস করেন তাদের ঘরগুলো ভেঙে গেছে। শুক্রবার পর্যন্ত ওই গ্রামের মূল সড়কের ওপরে ৮-১০ ফিট পর্যন্ত পানি ছিল। তবে শনিবার পানি কিছুটা কমছে। বন্যায় ঘর নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গৃহপালিত হাঁস, মুরগি, গরুও পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি কমলে আরো ক্ষয়ক্ষতি সামনে আসবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বাহারছড়া ইউনিয়নের মতো চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যা কবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। গত পাঁচদিনে পাহাড়ধস, দেওয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। যদিও সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, এখনো পর্যন্ত সাত উপজেলায় ২ লাখের বেশি পরিবারের ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।
জানা গেছে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমলেও পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানির কারণে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে সব ধরনের ভার্চুয়াল যোগাযোগও। মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বিভিন্ন মহল সাহায্যে এগিয়ে এলেও এখনো পর্যন্ত দুর্গম এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকাগুলো বেশি বিপর্যস্ত। ইতোমধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে সাত উপজেলায় সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শনিবারও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়েছে। একারণে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলার বেশিরভাগ অংশ পানির নিচে আছে। এই দুই উপজেলার গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে থাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এসব এলাকায় এখন নৌকাই একমাত্র বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি উপজেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা কোনোভাবে দিনযাপন করতে পারলেও দুর্গম এলাকা, বিশেষ করে- পশ্চিম বাঁশখালী, সাতকানিয়ার দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেসব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পৌঁছাচ্ছে না। এ কারণে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মাছের ঘের, পুকুরের মাছ, হাঁস-মুরগির খামার পানিতে ভেসে গেছে। অনেকের গৃহপালিত পশুও পানির স্রোতে হারিয়ে গেছে। পানি কমলে ক্ষতির চিত্র সামনে আসবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, পানির স্রোতের কারণে সাধারণ নৌকা সব এলাকায় পৌঁছাতে পারছে না। এ কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে দ্রুত উদ্ধার কাজ পরিচালনা ও ত্রাণ পৌঁছাতে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড স্পিডবোট নিয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৪ হাজার মানুষকে আনা হয়েছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত আছেন।
২৯৭ কিমি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত
বন্যার কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাগুলো।
আরও এক শিশুর মৃত্যু
বন্যার পানিতে ডুবে সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় ইসমাইল হোসেন (২) আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) রাতে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ইসলাম ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীনের ছেলে।
সাতকানিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান জানান, পরিবারের অগোচরে শিশুটি পানিতে তলিয়ে যায়। পরে আশপাশে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তাকে বাড়ির অদূরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
রাঙ্গুনিয়ায় সেতু ধস
পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের শিলক খালের উপর নির্মিত ব্রিজঘাট বেইলি সেতু ধসে রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে দুই পাশে হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। শনিবার (১১ জুলাই) ভোরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবব্রত দাশ জানান, শুক্রবার রাত থেকে দুধপুকুরিয়া এলাকায় পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত ছিল। একপর্যায়ে পানির চাপে সেতুটির একাংশ ভেঙে যায়। তবে ওই সময় সেতুতে কোনো যানবাহন ছিল না। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সেতুটি মেরামত করে চলাচল উপযোগী করতে অনুরোধ করা হয়েছে।